চলনবিলের সেই ‘নৌকাস্কুল’ এখন বিদেশে
পলাশ : রাইজিংবিডি ডট কম
Published:05 Jan 2016 03:29:10 PM Tuesday || Updated:05 Jan 2016 06:21:54 PM Tuesday
নৌকাস্কুলের সামনে মোহাম্মদ রেজওয়ান
রেজওয়ান পেশায় স্থপতি। তারই সৃজনশীল চিন্তার ফসল ‘নৌকাস্কুল’ বা ভাসমান স্কুল এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের পতাকা ওড়াচ্ছে। কম্বোডিয়া, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইনের মতো বেশকিছু দেশ তার উদ্ভাবিত নৌকাস্কুল চালু করেছে ।
চলনবিলের নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার একটি গ্রামের নাম সিঁধুলাই। এ গ্রামেরই এক বর্ধিষ্ণু পরিবারের সন্তান রেজওয়ান। বেড়েও উঠেছেন চলনবিলে। বন্যা ও বৃষ্টির কারণে প্রায়ই তার স্কুলে যাওয়া হতো না। তাই কীভাবে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো যায়, সে ভাবনা তার মাথায় ঢোকে শিশু বেলাতেই। বড় হয়ে ঢাকায় পড়তে যান। বুয়েট থেকে স্থপতি হয়ে বের হন। কিন্তু তার মগজের ভেতরে চলনবিল থেকেই যায়। ভাবতে থাকেন ব্যতিক্রমী সৃজন চিন্তক রেজওয়ান।
পরিসংখ্যান বলছে, মৌসুমী বন্যায় বাংলাদেশের এক পঞ্চমাংশ এলাকা প্লাাবিত হয়। অনেক সময় বড় বড় বন্যায় দেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার হয় গ্রাম-গহিনের স্কুল শিক্ষার্থীরা। বন্যার সময় দেশের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সালের বন্যায় স্কুল ডুবে যাওয়ার কারণে ১৫ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চলনবিলের গুরুদাসপুর উপজেলার সিঁধুলাই গ্রাম সে রকমই বন্যাকবলিত ও বড় জলাধারবেষ্টিত প্রত্যন্ত একটি গ্রাম ।
রেজওয়ান প্রথমে সিঁধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা নামে একটি অলাভজনক উন্নয়ন সংগঠন গড়ে তোলেন তার নিজ গ্রামে। নিজ গ্রামের উন্নয়ন কার্যক্রম দিয়েই শুরু হয় রেজওয়ানের যাত্রা। ভাবনায় ঢুকে পড়ে সৃজনী চিন্তার নৌকার মধ্যে স্কুল গড়ার স্বপ্নটা। তিনি শুরু করেন ‘ভাসমান স্কুল’। সেটা ২০০২ সালের কথা। ওই সময়েই এই নৌকাস্কুলের যাত্রা শুরু।
নৌকাস্কুলের যাত্রা শুরু হয় তার স্কলারশিপের মাত্র ৫০০ মার্কিন ডলার ও একটি ল্যাপটপ দিয়ে। প্রথম এক বছর তিনি বিভিন্ন স্থানে ই-মেইল করতে থাকেন সাহায্যের আশায়। তার আইডিয়াটা চোখে ধরে যায় বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের। সেখান থেকেই পেয়ে যান ৫ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি রেজওয়ানকে।
স্কুলের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল। এই বিদ্যুতে সন্ধ্যার পরও স্কুলের কার্যক্রম চালানো যায়। গ্রামেও আলো দেওয়া যায়। সাধারণ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের মতোই নৌকার ভেতরে শ্রেণিকক্ষ। পাঠাগার, কম্পিউটার ল্যাব সবকিছুই সংযুক্ত হয়। শুধু তাই নয়, এ নৌকাস্কুল চলনবিলের ভূমিতে স্থাপন করা সরকারি স্কুলগুলোর চেয়ে আরো বেশি আধুনিক হয়ে দাঁড়ায়। এ স্কুল কম্পিউটারসহ শিক্ষায় ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক অনেক ডিভাইস দ্বারা সুসজ্জিত হয়।
এক যুগের মতো সময় পথচলার মাঝেই বর্তমানে সিঁধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার (এসএসএস) এখন ১১১টি নৌকাস্কুল চলনবিলের ঘাটে ঘাটে ভিড়ছে। সেখানে প্রায় প্রায় ১ লাখ পরিবারের শিশুদের আধুনিক শিক্ষা-প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চার সুযোগ এনে দিয়েছে। একসময়ের জলঘেরা চলনবিলের পশ্চাৎপদ মানুষের সামাজিক পরিবর্তনের এক নবদিগন্ত রেখায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন স্থপতি রেজওয়ান।
এই স্কুল থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছে মেয়ে শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে অনেক সময়ই বাবা-মা মেয়েদেরকে স্কুলে পাঠাতে চান না। কিন্তু ঘরের কাছে নৌকার মধ্যে স্কুলে মেয়েদেরকে পাঠাতে আপত্তি হচ্ছে না কারোরই।
একটি নৌকাস্কুলের দৈর্ঘ্য ৫৫ ফুট ও প্রস্থ ১১ ফুট। এক সঙ্গে ৩০ জন শিশু পাঠ নিতে পারে একটি স্কুলে। শিশুদের পাশাপাশি তাদের মাধ্যমিক স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরা এমনকি লেখাপড়া জানা অভিভাবকরাও কম্পিউটারসহ তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন।
অভিনব এই পদ্ধতি উদ্ভাবন ও বাস্তবায়নে ইতিমধ্যেই ১৪টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন সিঁধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক স্থপতি মোহাম্মদ রেজওয়ান। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে থাকা কম্বোডিয়া, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও জাম্বিয়াসহ আরো অনেক দেশে চালু হয়েছে রেজওয়ানের মডেলের এই ভাসমান স্কুল।
রেজওয়ান জানান, পুরস্কারের অর্থে আরো নৌকাস্কুল, সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে গ্রাম আলোকিত করার প্রকল্পসহ স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার কাজ করছেন তিনি।
মোহাম্মদ রেজওয়ান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ভবিষ্যতে তলিয়ে যেতে পারে অনেক জনপদ। এ ছাড়া বাংলাদেশসহ বন্যাকবলিত বিভিন্ন দেশের জলমগ্ন অঞ্চলে জীবনয্দ্ধু একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ভাসমান স্কুলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন একটি মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, স্লোভানিয়ার মতো উন্নত দেশের প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমে যুক্ত হয়েছে এই স্কুল ভাবনা। তবে শুধু ভাসমান স্কুলেই থেমে থাকেনি সংস্থাটির কার্যক্রম। এখন ভাসমান স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও কৃষি বিষয়ক ট্রেনিং সেন্টারের কাজও করছে এই নৌকাগুলো।’
এই ভাসমান স্কুলের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আরো বড় মাপের কাজ করার ইচ্ছা রেজওয়ানের। বন্যাকবলিত এলাকায় অনেক সময় ফসলের ক্ষতি হয়। তাই তিনি এখন ‘ভাসমান খামার’ তৈরির পরিকল্পনা করছেন। যেখানে থাকতে পারে সবজি বাগান, মুরগির খামার কিংবা মৎস খামার। সঙ্গে ভাসমান স্কুলকে ভাসমান বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত উন্নীত করার স্বপ্নও তার রয়েছে। তবে এজন্য আরো বেশি তহবিল প্রয়োজন। এ তহবিল সংগ্রহ অনেক কঠিন বলে জানান। সেই কঠিন প্রচেষ্টাই এখন চালিয়ে যাচ্ছেন মোহাম্মদ রেজওয়ান।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা গ্রামবাসীকে এই ভাসমান স্কুলের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতে হয়তো ভাসমান খামার তৈরিও সম্ভব হবে। তার ভাসমান এই স্কুল নিয়ে বিখ্যাত তথ্যচিত্র নির্মাতা গ্লেন বেকার একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। ‘ইজি লাইক ওয়াটার’ নামের এই চলচ্চিত্রে নৌকাস্কুলের পাশাপাশি সিঁধুলাই গ্রাম আর চলনবিলের সৌন্দর্য-সম্ভাবনা ও জীববৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়েছে। তথ্যচিত্রটি এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে প্রায় ৮০০ বার প্রদর্শিত হয়েছে বলে রেজওয়ান জানিয়েছেন।
রাইজিংবিডি/চাটমোহর(পাবনা)/৫ জানুয়ারি ২০১৬/পলাশ/টিপু/রফিক
No comments:
Post a Comment