এই আমাদের ঢাকার লেক
কারো প্রাণের শহর আবার কারো কাছে প্রাণ খারাপ করা শহর। এমন একটি শহর যাকে একই সাথে ভালবাসাও যায়, আবার গালমন্দও করা যায়। ঢাকায় থাকা যেমন কষ্টকর তেমনই ঢাকাকে ছেড়ে থাকাটাও যেন কষ্টকর। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের এই ঢাকা শহর পার করে ফেলল এক এক করে ৪০০টি বছর। ৪০০ বছর আগে আমাদের এই শহর কেমন ছিল তা হয়ত অনেকেই নানান ছবিতে দেখেছেন বা ইতিহাস ও গল্প পড়ে জেনে ফেলেছেন। সবুজের সমারহ ও বহতা পানির কলতানে ভরা ছিল এই ঢাকা শহর। আর এখন? এখন শুধু ট্র্যাফিক, লোডশেডিং ও আবর্জনায় ভরে গেছে এই শহর। শুধু কি তাই? মানুষের ভিড়ে দম নেয়াটাই কঠিন হয়ে পড়েছে যেন এখন। যেদিকে তাকানো যায় শুধু খারাপ আর খারাপে ভরা। আসলেই কি তাই? ভাল কিছুই কি নেই এই ঢাকা শহরে? তাহলে কিসের মায়ায় এত মানুষ পড়ে আছে এখানে? ভাল তো অবশ্যই আছে। শুধু দুচোখ মেলে দেখার চেষ্টা করতে হবে একটু এই যা। এই যেমন ধরুন ঢাকা শহরের লেক গুলোর কথাই।
প্রাণচঞ্চল ঢাকার মানুষের জন্য এক মুহূর্ত নিঃশ্বাস নেবার জায়গা যেন এইসব লেকগুলো। প্রান খুলে প্রকৃতির স্বাদ নেবার সুযোগ এর থেকে ভাল করে আর কোথাও পাওয়া যাবেনা বোধ করি। সেই সাথে নতুন প্রজন্মও যারা ঢাকায় বড় হচ্ছে তারাও সুযোগ পাচ্ছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর। দমবন্ধ এই ঢাকা শহরে অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে গণ্য হয় ঢাকার লেকসমূহ।
মজার ব্যাপার হল আমাদের এই ঢাকা শহর কিন্ত চারিদিক দিয়ে পানি দ্বারা বেষ্টিত। উপর থেকে দেখার সুযোগ হলে ঢাকা শহরকে মনে হবে পানির মধ্যে ভাসমান টুকরো টুকরো দ্বীপের মত। এর কারণ হল আমাদের ঢাকা শহরকে ঘিরে আছে নানান নদ নদী ও খাল বিল। ঢাকার আশেপাশে আছে বুড়িগঙ্গা, কালিগঙ্গা, ইছামতি, শীতলক্ষ্যার মত বড় নদীর পাশাপাশি বংশী, তুরাগ, বালু ইত্যাদি ছোট নদী ও উপনদীগুলো। সেই সাথে আছে নানান খাল বিল। এত সব নদ নদীর মাঝে থেকেও ঢাকায় যেন পানির দেখা মেলা ভার। তারপরও ঢাকার লেকগুলো দিনের পর দিন যান্ত্রিক ঢাকায় প্রান সঞ্চার করে চলছে। ঢাকার লেকগুলর মধ্যে আছে ধানমণ্ডি লেক, গুলশান-বারিধারা লেক, ক্রিসেন্ট লেক ইত্যাদি। আরও আছে উত্তরা লেক ও হাল আমলের নতুন আকর্ষণ হাতির ঝিল। সেই সাথে ঢাকা ও মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট এর ভেতরেও আছে ছোটোখাটো দুই তিনটি লেক। এছাড়া বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্পের ভেতরে আছে তাদের নিজস্ব লেক যা বেশিরভাগ প্রাকৃতিক নয়। মানুষের সৃষ্টি।
এসব লেকগুলো শুধু মাত্র জলাধার নয়। এদের ঘিরে তৈরি আছে নানান রকম বিনোদনের ব্যবস্থাও। শুধু জলাধার উপভোগ করাই নয় আছে প্রকৃতির সবুজের ছোঁয়াও। প্রত্যেকটি লেকের পাড় জুড়েই আছে নানান রকমের গাছপালার সমারোহ। কোন কোন লেক ঘিরে তৈরি হয়েছে নানান দৃষ্টিনন্দন প্ল্যাটফর্ম যেখানে দাড়িয়ে প্রকৃতি ও জলাধারকে উপভোগ করার ব্যাবস্থা আছে। বিশাল বিশাল লেকগুলোকে যুক্ত করা হয়েছে হরেক রকমের ব্রিজ তৈরি করে। সেখানেও আছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। যারা নৌকা ভ্রমনের মজা নিতে চান তারা এইসব লেকে বোটিংও করতে পারেন। শুধুই বিনোদনই নয় নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কিছু লেক পেয়েছে পরিচিতি। উৎসবের দিনগুলোতেও লেকগুলোকে ঘিরে নানান আয়োজন চলে বছরজুড়েই।
ঢাকার লেকের কথা বললে যে লেকের নাম সব প্রথম আসে তা হল ধানমণ্ডি লেক। এই লেকটি বিনোদন, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অন্যতম একটি মাধ্যম হয়ে গড়ে উঠেছে। ঢাকার প্রথম সরকারিভাবে সাজানো লেকও এটি। সর্পিল ধারায় বয়ে চলা এই লেকটি ঘিরেই তৈরি হয়েছে পায়ে হেঁটে চলার পথ যেখানে প্রতিদিনই দেখা মেলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের। আছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করা রবীন্দ্র সরোবর যা সংস্কৃতি প্রেমিকদের মুল আকর্ষণ হিসেবে বিবেচ্য। সেই সাথে আছে মাছ ধরা, নৌকা ভ্রমন করার ব্যবস্থাও। মোট কথা গ্রামীণ জীবনের স্বাদ পাওয়া যাবে এই লেকের ধারে আসলে। আরও আছে খাদ্যপ্রেমীদের জন্য নানা রকম খাবারের আয়োজনও। প্রতিদিনি অসংখ্য মানুষের দেখা মেলে লেকের পাড়ে, তারা আসেন আড্ডা দিতে।লেকের পাড়ে আছে বেশ কয়েকটি বসার স্থান আছে। এখানে বসে খোলা হাওয়ায় পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠতে দেখা যায় নগর জীবনে ব্যাস্ত নানান রকমের মানুষদের।
গুলশান-বারিধারা লেকঃ
গুলশান এক থেকে শুরু হয়ে বারিধারা পর্যন্ত বহতা এই লেকটি গুলশান এলাকার চেহারা বদলে দিয়েছে একদম। উচ্চবিত্তর সাথে নিম্নবিত্ত মানুষের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে এই লেকটি। একই সাথে সুউচ্চ ভবন ও টিনের চালার ঘরের দেখা মিলে এই লেকের আশপাশ দিয়েই। তবে ধানমন্ডি লেকের মতন এত সুপরিশরে সাজানো নয় এই লেকটি, যদিও বারিধারার অংশটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ছোট একটি পার্ক ও হাঁটার রাস্তাও। এখানে এসে পরিবার পরিজন নিয়ে প্রায় আড্ডা দিতে দেখা যায় অনেককেই। অন্যান্য লেকের তুলনায় কিছুটা খালি থাকে দিনের অন্যান্য সময় এই লেকটি।
সংসদ ভবনের পেছন দিকে অবস্থান এই লেকের। এই লেকের পেছনের চন্দ্রিমা উদ্যানে আছে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রাহমানের মাজার। আকারে ও আয়তনে বেশ ছোট এই লেকটি তারপরও একে ঘিরে মানুষের বিচরণ খুব একটা কম নয়। দিন থেকে রাত পর্যন্ত এখানে ভিড় জমিয়ে রাখেন সব ধরনের মানুষেরা। বসে বসে আড্ডা দেয়ার মত জায়গার অভাব নেই এখানে। প্রকৃতি ও স্থাপত্যকলার সুন্দর মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায় এই লেকের ধারে আসলেই।
হাতিরঝিলঃ
এ বছর সংস্কার করে উদ্বোধন করা হয়েছে ঢাকার অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এই লেকটি। প্রায় ৩০০ একর জায়গা অধিগ্রহন করার পরে দৃষ্টিনন্দন এই লেকের সংস্কারকার্য করা হয়েছে। নগরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি রাজধানীর পুর্ব- পশিম অংশকে এক সাথে যুক্ত করেছে এই লেক। গুলশান লেকের সাথেও যুক্ত হয়েছে এই বেগুনবাড়ি-হাতিরঝিলটি। লেকটিকে ঘিরে যেমন আছে চলাচলের জন্য সেতু ও রাস্তা তেমনই আছে হাটার জন্য রাস্তা। বিনোদনের অন্যতম স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এই লেকটি বর্তমানে। রাতের হাতিরঝিলে নানা রঙের খেলা দেখতে ছুটে আসছেন সব বয়সের মানুষরাই।
এছাড়াও ঢাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লেকগুলোকেও কমবেশি প্রকৃতি ও আধুনিকতার মেল বন্ধন ঘটিয়ে সাজানো হয়েছে নাগরিক জীবনকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আনতে।
সমস্যা গুলো-
এসব লেক যে শুধু প্রাকৃতিক ও বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু তা কিন্তু নয়। ঢাকার প্রাকৃতিক ও যান্ত্রিক বৈষম্যও দূর করছে এসব লেকগুলো। ঢাকার জলাবদ্ধতা কমানো, পানির নিষ্কাশন ব্যাবস্থার উন্নতি ও সেই সাথে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার জন্য এই লেকগুলোকে ব্যাবহার করা হয়। সেই সাথে যোগাযোগ ব্যাবস্থার উন্নতিও ঘটানো হয়েছে এসব লেকগুলোকে ব্যবহার করেই। মোট কথা ঢাকার পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নেরও অন্যতম সহায়ক এইসকল লেকগুলো। তবে এত উপকারের এই লেকগুলর বর্তমান অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। ধানমন্ডি লেকের মুল অংশটিকে বাদ দিলে অনেক অংশেই পানির আশেপাশে আবর্জনা স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। সেই সাথে দিনের আলোয় ও রাতের অন্ধকারে অনেকাংশেই চলে অসামাজিক কাজ।
গুলশান লেকের ভেতরে গড়ে উঠা বস্তি ঘরের কারনে দিনদিন দূষিত হয়ে পড়ছে লেক। এসব ঘরের কোনটারই নেই পয়নিশকাশনের আলাদা ব্যাবস্থা। ফলে দিন দিন এসব ঘরের নানান আবর্জনা পানিতে মিশে গিয়ে ভয়াবহ দূষণ ছড়িয়ে দিচ্ছে লেক জুড়ে। আরও আছে অবৈধ দখলদার। সমাজের নানা অংশ ও দেশের নানা প্রান্তের মত এসব লেকের দিকেও চোখ দিয়েছে অবৈধ দখলদাররা। তাদের দখলের ফলে দিনদিন নষ্ট হচ্ছে এসব লেকের পরিবেশ। ছোট হয়ে যাচ্ছে লেকের সীমারেখা। এছাড়াও যে সকল নাগরিকদের সুন্দর জীবন নিশ্চিত করছে এই লেকগুলো তাদের ফলেই আজ ধুঁকে মরতে বসেছে তারা। প্রতিদিন মানুষেরা প্রকৃতির স্বাদ নিতে, জীবনের একঘেয়েমি দূর করতে যে লেকের পাড়ে ছুটে আসেন তাকেই নংরা করে রেখে যান চলে যাওয়ার মুহূর্তে। দিনদিন মানুষের ফেলে যাওয়া এসব নংরা আবর্জনার ফলে লেকে প্রাকৃতিক দূষণ হচ্ছে যা কোন ভাবেই কাম্য নয়। এসব বিষয়ের দিকে নজর দিয়ে যদি এসব সমস্যা দূর করা না হয় এখনই তাহলে সেদিন দূর নয় যেদিন ঢাকায় থাকতে হলে প্রকৃতিকে অন্য জগতের নিদর্শন বলেই মেনে নিতে হবে।
এক সময়ের সবুজে ঢেকে থাকা এই ঢাকা শহরে এখন যেমন কমে এসেছে সবুজের সমারোহ তেমনই দিনদিন কমে যাচ্ছে ঢাকার আশেপাশের নানা জলাধার ও খাল-বিল। ঢাকাকে নতুন রূপ দিতে গিয়ে অনেক জলাধার ইতিমধ্যেই নাম লিখিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। কংক্রিটের খাচায় পরিণত হতে যাওয়া ঢাকাকে এখন বাঁচিয়ে রেখেছে এর পার্ক ও লেকগুলোই। আমাদের প্রকৃতির সান্নিধ্য দিয়ে যাওয়া এই লেকগুলোকে সঠিকভাবে সংরক্ষন করে আমাদের জীবনের চাকা স্বচ্ছন্দতার সাথে চালিয়ে নেয়ার জন্য এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। সবার সাহায্যে ঢাকা ফিরে পেতে পারে তার হারিয়ে ফেলা সুন্দর রূপ।
ফটো ক্রেডিট-
প্রচ্ছদের ছবিতে আছে গুলশান লেক- ফটোগ্রাফার অনিক রহমান
ধানমণ্ডি লেকের ছবি- ফটোগ্রাফার এফ জামান
হাতির ঝিলের ছবি- উইকিপিডিয়া
No comments:
Post a Comment