Friday, 8 January 2016

Heritage in Bangladesh

দেখা হলো না বজ্রসত্য

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
Published:07 Jan 2016   06:24:02 PM   Thursday   
দেখা হলো না বজ্রসত্য
ফেরদৌস জামান : হাতিয়া দ্বীপ থেকে ঢাকা ফেরার পথে নোয়াখালী হয়ে আসছিলাম। মেইল ট্রেনে ঢাকা পর্যন্ত শোভন শ্রেণীর ভাড়া মাত্র ৫৬ টাকা। রেলের ভাড়া তখনও বাড়ানো হয়নি। সুতরাং সেই ভাড়া স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল। তবে অজকের সাথে তুলনা করলে মাঝে অনেক ফারাক। আরোহণের সময় ট্রেনের পরিবেশ নিরিবিলি ও ফাঁকা থাকলেও আসল মজাটা শুরু হয় কয়েক ঘণ্টা পর। হেন স্টেশন নেই যেখানে ট্রেন থামল না! সেইসঙ্গে ক্রমেই বাড়তে লাগল মানুষে ভিড়! গভীর রাতেও ট্রেনে যে কি পরিমাণ যাত্রী চলাচল করে তার ধারণা নিতে নোয়াখালী-ঢাকা রুটে একবার অন্তত ভ্রমণ করে দেখতে পারেন।

অনেক যাত্রীর সাথে গোটাকয়েক ব্যাগ-বোচকা, লেপ-তোশক এমনকি খড়ি পর্যন্ত আছে। নিয়ম অনুযায়ী একটি আসন দুইজনের জন্য বরাদ্দ কিন্তু যখন লক্ষ করলাম সিট ধরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি ঘুমে শরীরের ওপর বার বার ঢলে পড়ছেন, তখন তাকে পাশে বসতে দিলাম। এরপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি। কোলের মধ্যে সুরসুরি অনুভূত হওয়ায় আচমকা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। দেখি মুখোমুখী দুই সিটের ফাঁকের মেঝেতে আসন পেতে আরামে ঘুমোচ্ছেন মাঝবয়সী এক যাত্রী, যার মাথা আমার কোলে। বিপত্তিতে পড়া ঘুমন্ত মানুষটিকে না পারছি ডেকে তুলে দিতে, না পারছি অস্বস্তি সহ্য করতে।

এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ হাউমাউ কান্নার রোলে জেগে উঠল বগির সব যাত্রী। দরজার কাছে সামান্য জায়গাটায় বসা লোকটির মৃগী রোগের খিঁচুনি শুরু হয়েছে। আর তাতেই তার স্ত্রী ভয়ে চিৎকার করছে। খানিক পর তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখি মেঝেতে শোয়া লোকটির মুখ দিয়ে লালা ঝরছে। গলায় ঝুলছে মোটা সুতায় বাঁধা এক খণ্ড চামড়ার লকেট। দারিদ্র্যের কারণে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারে না তারা- বিপদে ঐ লকেটটিই ভরসা। সুতরাং সর্বক্ষণ তা গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হয়। কিছুক্ষণ পর লোকটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করল। এবার শুরু হলো স্ত্রীর অকথ্য ভাষায় গালাগাল। সে বারবার বলতে লাগল, তোর বাপ-মা মইরা বাইচা গেছে, আর মরণ জ্বালায় ফালায় গেছে আমারে, আল্লা গো আমার মরণ হয় না কেন, এই আজাব আর কত দিন টানমু! ইত্যাদি ইত্যাদি।
 
ওদিকে স্বামী কেবল অসহায় দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। টিকিট কাটার সময় ৫৬ টাকায় ঢাকায় রওনা করতে পারার আনন্দে বেশ আপ্লুত ছিলাম, সে আবেগ হাওয়ায় উড়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। ভ্রমণসঙ্গী শফিক চাকরি করে এক বেসরকারি ব্যাংকে, পোস্টিং কুমিল্লার লাকসাম শাখায়। সুতরাং তার সেখানেই নেমে য়াওয়ার কথা। রাত একটায় সে নামল বটে তবে একা নয়, সাথে আমরাও নেমে গেলাম। ভেবে দেখলাম ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছতে গরমে পাউরুটি হয়ে যেতে হবে। অতএব, এই সুযোগে কুমিল্লা শহর দেখে নেয়া যাক।

ভ্রমণের উদ্দেশে কুমিল্লা গিয়ে সকলেই সর্বপ্রথম যে জায়গাটি দেখতে চান, আমরাও সেখানে গেলাম। পরের দিন সকালে বাসে উঠে পড়লাম। বাস থেকে নামতে হবে শহরের অদূরে ‘টমসম ব্রিজ’ নামক স্টপেজে। সেখান থেকে ময়নামতি শালবন বিহার আধা ঘণ্টার পথ। ময়নামতির পথ নির্দেশনা পেতে বাসে দু’এক জনের সাথে কথা বলে এই স্টপেজের নাম জেনে নিলাম। দারুণ একটা নাম! নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে! সহজ-সরল বন্ধু মাসুদ রায়হানের তো নামটা বেজায় ভালো লাগল। কিন্তু কেন লাগল, জিজ্ঞেস করলে বলতে পারল না। শুধু বলল, টম...সম... ব্রিজ, হোয়াট আ নেইম! ব্যস এতটুকুই। অবশ্য স্থানীয়দের কাছে নামটির ইতিহাস সম্বন্ধে কিছুই জানা যায়নি। বাস থেকে নামার আগে ভেবেছিলাম বড় পুরনো কোন ব্রিজ থাকবে। কিন্তু না, ব্রিজ তো দূরের কথা একটা সাঁকোও চোখে পড়ল না। এবার সিএনজি অটোরিকশায় আরোহণ করে এগিয়ে চললাম শালবনের দিকে।

মৌসুমটা বসন্ত ঋতুর একেবারে শুরুর দিকে, সুতরাং পথে ধুলা ছিল প্রচুর। দূর দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ‘শিক্ষা সফর’, ‘বন ভোজন’, অথবা ‘খুশিতে একদিন’ জাতীয় ব্যানার টানিয়ে বাস, মাইক্রোবাসে করে উপস্থিত হয়েছে ময়নামতি দেখতে। প্রথমে গিয়ে প্রবেশ করলাম স্থানীয় যাদুঘরে। যাদুঘর পরিদর্শনের শেষে প্রাঙ্গণে ফুলবাগানে হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ করি উন্মুক্ত পাকা মেঝেতে শোয়ানো একটি বৃক্ষের লম্বা কান্ড। নিকটে গিয়েও বুঝতে পারলাম না তার তাৎপর্য। দু’একজন দর্শনার্থীকে মনোযোগ দিয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতেও দেখলাম। সেটি আসলে একটি জীবাশ্ম। না দেখলে বুঝতামই না যে, মাটি চাপা পড়ে লক্ষ বছরের পরিক্রমায় একটি গাছ পাথরে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে।
 
যাদুঘর থেকে বেড়িয়ে কয়েক কদম হেঁটে গেলে শালবন বিহরের প্রবেশদ্বার। লালমাই-ময়নামতি পাহাড় শ্রেণীর প্রায় মাঝামাঝি এলাকায় বিহারটি অবস্থিত। এককালে বিহার ও তার আশপাশের উঁচু এলাকা শালগাছের বনে আবৃত ছিল। বিহারের আশপাশে এখনও অনেক শালগাছ দেখা যায়। যে কারণে অত্র এলাকার নাম হয়েছিল শালবন গ্রাম। বিহার আবিষ্কৃত হওয়ার পর যা ‘শালবন বিহার’ নামে পরিচিতি পায়। এর প্রকৃত নাম কি ছিল তা অবশ্য আজও জানা যায়নি। দশ টাকা টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করতেই বিহারের টকটকে লাল দীর্ঘ প্রাচীর দেখে যে কারও মন ভরে যায়। প্রাচীরের চারপাশ ঘুরে দেখার জন্য তৈরি করা হয়েছে ঝকঝকে পায়ে হাঁটা পথ। তার পাশ দিয়ে লাগানো নানা প্রজাতীর ফুল ও পাতাবাহারের গাছ অত্র এলাকার শোভা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করেছে। বিহার প্রাঙ্গণের ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় সম্পুর্ণ জায়গাটি চার কোণাকৃতির। প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ ১৬৯ মিটার। প্রাচীর ধরে চারিধারে ভিক্ষুদের জন্য ১১৫টি কক্ষ নির্মিত হয়েছিল। গবেষণায় বেড়িয়ে এসেছে, এ বিহারে পর্যায়ক্রমে ৬টি নির্মাণ যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে। ভেতরে মূল মন্দির ছাড়াও আবিষ্কৃত হয়েছে অনেক স্থাপনার চিহ্ন। কিছু কিছু জায়গায় খনন কাজ চলমান, আবার দু’একটি স্থাপনা আবিষ্কারের পর তার ভিত্তিমূল ধরে গেঁথে তোলা হচ্ছে লাল প্রাচীর। যতদূর জানা যায় বাংলাদেশে আবিষ্কৃত বৌদ্ধ বিহারগুলোর মধ্যে এককভাবে একমাত্র শালবন বিহারকে কেন্দ্র করেই আশপাশে ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় পঞ্চাশটির মত আলাদা স্থাপনা। যার মধ্যে বেশ কয়েকটি পড়েছে নিকটেই ময়নামতি সেনানিবাস এলাকার অভ্যন্তরে। 

বিহার পরিদর্শন করে বেরিয়ে আসার সময় প্রবেশদ্বারে সাক্ষাত হয় ময়নামতি শালবন বিহারের সহকারী কর্মকর্তার সাথে। কথা বলে তার অভিজ্ঞতা থেকে অনেক তথ্যই জানা গেল। ১৯৯৪ সালে অদ্বিতীয় বজ্রসত্য উদ্ধার খননকার্যে তার অভিজ্ঞতার কথা জানান। সেই খননকার্যে তিনি নিজেও সম্পৃক্ত ছিলেন। জানতে চাইলাম কোন বজ্রসত্য- মঈন উদ্দীন-ফখরুদ্দীন শাসিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যেটা ফ্রান্সের গিমে যাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য পাঠানো হয়েছিল?
বললেন, ঠিক বলেছেন। এবার আমাদের বিস্ময় বেড়ে গেল। বললাম, আমরা তো জানি তা জাতীয় যাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে। তিনি বললেন, না, ময়নামতি যাদুঘরেই ছিল এবং বর্তমানে এখানেই রয়েছে।

ফ্রান্সের ব্যাপারে যতদূর জানা যায়, তারা রেপ্লিকা প্রস্তুতে বিশ্বের অদ্বিতীয়। সুতরাং আসলটি যে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে তা আমরা কীভাবে বুঝব? আমাদের এমন শঙ্কায় তিনি আশ্বস্ত করে বললেন, পাঠানোর সময় তিনি ব্যক্তিগতভাবে কৌশলে একটি বিশেষ চিহ্ন দিয়ে দিয়েছিলেন। ফিরিয়ে আনার পর পরখ করে দেখেছেনে ঠিক আছে। সুতরাং সন্দেহের কারণ নেই। অমূল্য বজ্রসত্য কুমিল্লা শালবন বিহারের নিকটবর্তী অপর একটি বিহার স্থাপনা থেকে উদ্ধার করা হয় যা ময়নামতি সেনানিবাস এলাকার মধ্যে পড়েছে। যাদুঘর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম অথচ খেয়ালই করিনি কোনটি বজ্রসত্য। আমরা পুনরায় যাদুঘর পরিদর্শনে উদ্যত হলে তিনি বললেন, অফিস টাইম শেষ। অতএব, দেখতে চাইলে আজ আর সম্ভব নয়।
 
একেই বলে কপাল! আশাহত হৃদয়ে রওনা হলাম কুমিল্লা শহরের দিকে। খুঁজে বের করলাম আসল মাতৃভান্ডার। ভোজন রসিক মাসুদ রায়হানের কথা- কুমিল্লা এসেছি অথচ রসমালাইয়ের স্বাদ পরখ করে দেখব না তা হয় না। শহরের কান্দীরপাড় থেকে কয়েক মিনিট হেঁটে গেলেই রসমালাইয়ের দোকান- মাতৃভান্ডার। ভেবেছিলাম দোকানে বসে পিরিচে করে খাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে, কিন্তু না, সে ব্যবস্থা নেই। কমপক্ষে এক কেজির নিচে বিক্রি হয় না। বাধ্য হয়ে প্যাকেটে করে নিয়ে ভাবতে থাকলাম, কোথায় বসে খাওয়া যায়? হাঁটতে হাঁটতে প্রবেশ করলাম অজিতগুহ মহাবিদ্যালয়ের মধ্যে। মাঠের গোলচত্তরটায় বসে রসমালাইয়ের রসে আঙুল চুবিয়ে খেতে শুরু করলাম। পাশেই টাউন হল মাঠ থেকে ভেসে আসছিল উল্লাস ধ্বনি। ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের খেলা প্রজেক্টরের মাধ্যমে বিশাল পর্দায় দেখানো হচ্ছে। ইচ্ছা থাকলেও সেখানে বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব হয়নি, কারণ আমাদের ফিরতে হবে সেই লাকসাম।

পরদিন বেশ আগ্রহ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বজ্রসত্য দেখব বলে। পৌঁছে জানতে পারি সাপ্তাহিক ছুটির কারণে যাদুঘর বন্ধ। আমাদের অবার ঢাকায় ফিরতেও হবে সেদিন। অতএব, পরবর্তীতে কখনও দেখা যাবে, এই আশায় রওনা করলাম সেনানিবাসের দিকে। সেখানে ‘কটিলামুড়া’র অবস্থান। সেনানিবাসের দক্ষিণ গেট থেকে উত্তর গেটে যাতায়াতের জন্য রয়েছে বিশেষ বাস সেবা। চার টাকা টিকিটে বাসে উঠে পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট স্টপেজে। এরপর তো সেনা চেকপোস্টের প্রশ্নবাণে ভেসে যাওয়ার পরিস্থিতি। তাদের সন্তষ্ট করতে সক্ষম হলেও জুড়ে দেয়া হলো কঠিন শর্ত- ছবি যেন না তোলা হয়! কি আর করা, ডিজিটাল যুগে অ্যানালগ হয়ে ঘুরে দেখতে হলো কটিলামুড়া। একে তো দর্শনার্থী বলতে কেবল আমরা। মনে হচ্ছিল দ্বিতীয়ত কেউ যেন সর্বক্ষণ আমাদের দিকে লক্ষ রাখছে। সুতরাং সেখানে যতক্ষণ অবস্থান করলাম অস্বস্তিটা মনের ভেতর ঘুরঘুর করতেই থাকল। তবে সত্য কথাটি হলো, চান্সে কিন্তু ক্যামেরার সদ্ব্যহার আমরা ঠিকই করে নিয়েছি।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ জানুয়ারি ২০১৬/তারা   

No comments:

Post a Comment