Sunday, 3 January 2016

Raikong Lake Bangladesh

রাইক্ষং লেক যেন এক টুকরো নীল কাচ

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
Published:04 Jan 2016   12:18:33 AM   Monday   
রাইক্ষং লেক

রাইক্ষং লেক

ফেরদৌস জামান : তিন বছর আগের কথা, ২০১২ সাল। রমজানের ঈদের ঠিক পরের দিন ২১আগস্ট। ট্রেন ছাড়বে রাত দশটায়। ঈদ উদযাপনে সবাই বেড়াতে চলে যায় যার যার গ্রামের বাড়িতে। আমি গিয়েছিলাম বন্ধুর বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে। ঈদের দিন রাতে লঞ্চে চড়ে  ভৈরব এসে পৌঁছি পরের দিন সকাল এগারটায়। গভীর রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে ঠাহর করতে না পারায় মাঝ নদীর এক ডুবোচরে আটকে যাই। প্রায় আড়াই-তিন ঘন্টার সেই পরিস্থিতিতে উৎকন্ঠায় কেবলই ভেবেছিলাম, রাইক্ষং লেক যাওয়া মনে হয় আর হবেনা। 

ভৈরব থেকে বাসযোগে ঢাকায় এসে মাত্র কয়েক ঘন্টায় সমস্ত কেনাকাটা ও ব্যাকপ্যাক সাজিয়ে রওয়ানা দেই কমলাপুরের উদ্দেশ্যে। গিয়ে দেখি সবাই উপস্থিত।  স্বপন দিনাজপুর থেকে, সৃজন, আদিত্য ও রায়হান বগুড়া, মেহেদী কুমিল্লা এবং সেরাজুল চলে এসেছে চাঁদপুর থেকে। ঢাকায় ছিল একমাত্র সুজিত। চট্টগ্রাম মেইল ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছতে নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে দু-তিন ঘন্টা দেরি করবেই। সে হিসেবে চট্টগ্রাম গিয়ে অবতরণ করি সকাল পৌনে নয়টায়। ঈদের দ্বিতীয় দিন তাই রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কম। ভাড়াও বেশি।  চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি বান্দরবানের বাসের আশা বাদ দিয়ে চেপে বসি কেরানিরহাটের বাসে। কেরানিরহাটে হালকা নাস্তা সেরে রিজার্ভ করি একটি মাহিন্দ্রা অটোরিকশা। বান্দরবান পর্যন্ত ভাড়া পাঁচশ টাকা।


অভিযাত্রী দলের কয়েকজন

বান্দরবান থেকে দিনের শেষ বাসে যাত্রা করি কৈক্ষং ঝিরিঘাট। পাহাড়ের মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ। চারিদিকে শুধু সবুজের সমারোহ। মাঝে মাঝেই লকলকে ডালপালা ও লতাগুলো নূয়ে পড়েছে রাস্তার উপরে। কখনও কখনও দূর পাহাড়ের চূড়াকে গ্রাস করে রেখেছে অলস মেঘের ভেলা। তারই মাঝদিয়ে এগিয়ে চলছে আমাদের বাস।

বাস জার্নি শেষে এরপর ত্রিশ টাকায় নৌকায় যাত্রা শুরু করলাম আমরা। বাংলাদেশে উৎপন্ন একমাত্র নদী সাঙ্গুর স্রোত কেটে কেটে উজানে চলছে নৌকা। সরু নৌকার নিচু ছাউনির তলে বেশ চাপাচাপি করে বসেছি।

প্রশাসনের বাড়াবাড়ি এবং গাইড চক্রের অনাকাঙ্খিত বিষয় এড়াতে রুমা বাজারের আগেই উপজেলা ঘাটে অবতরণ করি। এরই মধ্যে সন্ধ্যা পেরিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে। আধাঘন্টা হেঁটে গিয়ে আশ্রয় মেলে পরিত্যক্ত রিসোর্টের এক কটেজে। পাহাড়ের মাথা এবং পাঁজরের মাটি সমতল করে নির্মিত রিসোর্ট।  বাজারে রেস্তোরাঁ থাকলেও নিচে নেমে খেয়ে আসার  ধৈর্য সহ্য হচ্ছেনা। যার যার ব্যাগে শুকনা খাবার যা ছিল, রাতের খাবার তাতেই সারতে হলো।


উঁচু থেকে রাইক্ষং লেক

ভোরে উঠে প্রস্তুত হয়ে ট্রেকিং শুরু করে দিলাম। এক টানে প্রায় ষোলশ ফুট নিচে নেমে উপত্যকার মাঝ দিয়ে পথ। জলের ধারা বইছে কখনও মাঝ দিয়ে, কখনও পাহাড়ের দেয়াল ঘেষে। জলের সেই ধারা এপার-ওপার করতে করতে আমরা পোঁছে যাই উচুএক পাহাড়ের গোড়ায়। যার মাথায় অবস্থিত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বসতি ছাইকত পাড়া। একে তো পেয়েছে ক্ষুধা, তার উপর দিয়ে রোদের তীব্রতায় শরীর পুড়ে যাওয়ার উপক্রম। হালকা কিছু খেয়ে ঝিরির জলে বোতল ভরে নিয়ে পূর্ণ প্রস্তুতি পূর্বক উঠতে থাকলাম। মাঝপথে রোদের তীব্রতায় একেকজনের প্রাণ যায় যায়! বৃহৎ গাছটার ছায়ায় একটা লম্বা বিরতি টানতে হলো। গা ছেড়ে দিয়ে এদিক সেদিক যে যেমনে পারল হেলে পড়লাম।

পাহাড়ের পথ স্বভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে থাকে। কিন্তু এতটাই কষ্টকর হয়ে থাকবে সে ধারণা জানা ছিল না। সর্বোচ্চ বসতির খানিক নিচ দিয়ে ট্রেইল এগিয়েছে এ্যানোপাড়ার দিকে। মাত্র কয়েকটা ঘর নিয়ে মুড়ং জাতীর ছোট্ট পাড়া। পাড়ায় প্রবেশ করেই চোখে পড়ে মানুষের জটলা। দু-এক সপ্তাহ পরেই জুমের ধান কাটা শুরু হবে। পাড়াজুড়ে চলছে তার প্রস্তুতি। দূর পাহাড়ের শরীরে জুমের ধানে সবুজের ভাটার পর লেগেছে সোনালী আভার আস্তরণ। সব মিলিয়ে এক ধরনের উৎসবের আমেজ- কদিন পরেই ঘরে আসবে নতুন ফসল।


পাহাড়ীদের বসতি

পাড়ার এক বৃদ্ধ জুম চাষীর ঘরে থাকার ব্যবস্থা হয়। সন্ধ্যায় গল্পের আসরে বর্ণনা করেন তার নিজ অভিজ্ঞতা থেকে নানা গল্প। জীবনে কতটা বাঘ দেখেছেন, শিকার করেছেন কতটা ভাল্লুক, কতটা হরিণ ও বুনো শুকর হাত থেকে পালিয়েছে ইত্যাদি। ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা হলেও বুঝতে তেমন অসুবিধা হয়নি।

ওদিকে রান্না হচ্ছে মিষ্টি কুমড়ার তরকারী ও জুম চালের ভাত। যথাসময়ে খাবার আমাদের সামনে চলে আসল। গরম ভাত; দেখতে বেগুনি রঙের এবং আকারেও বেশ বড় । সনাতনী পদ্ধতিতে ঘরে কোটা চাল, খেতে হালকা মিষ্টি স্বাদের, শুধুমাত্র লবণ দিয়েও খাওয়া যায়। বৃদ্ধ সতর্ক করে জানালেন, পরবর্তী পথের একপর্যায়ে পড়বে অন্ধকার এক জায়গা। যেখানে মুড়ংদেরকে মৃত্যুর পর কবর দেয়া হয়। সেখানে হঠাৎ উদয় হয় অজানা এক অপশক্তির। যা কেবল ভয় পাইয়েই ক্ষান্ত হয় না, কখনও কখনও মানুষের মাথাও কেটে ফেলে! এমন সংবাদ শুনার পর সহযাত্রীদের আতঙ্কের দৃষ্টি তো পরস্পরের দিকে! পরক্ষণেই অবশ্য অভয় দিয়ে বলেন, ওসব আগেরকার দিনের ঘটনা। এখন আর ঘটে-টটে না।

যাত্রার চতুর্থ দিন শুরু। এই দিনেই কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছা সম্ভব। রাতের খাবারে কেউ ছাড় দেয়নি। শেষ অবধি পেটে যা ধরেছে, প্রত্যেকেই সে পর্যন্ত খেয়ে নিয়েছে। ফলে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায়।


ঝর্ণার পানিতে পিপাশা নিবারণ

পরে ট্রেকিংয়ের একপর্যায়ে পেয়ে যাই ভয়ার্ত বর্ণনার সেই জায়গা। ঘন গাছের ছায়ায় অন্ধকার প্রায়। গা ছমছম করা নিরবতা ভেঙ্গে চারিদিক থেকে সমস্বরে কেবল ভেসে আসছে অজশ্র ঝিঝিপোকার চিৎকার। এরই মাঝে উঠে যাই অন্তত এক হাজার ফুট। ছোট্ট ঝর্ণাটার গোড়ায় একা বসে রেস্ট নিচ্ছে ত্রিপুরা কিশোর সুরিয়ে। তার দেখাদেখি নিজেরাও খানিকটা আরাম করে নিলাম। ঝর্ণাধারায় মুখ লাগিয়ে পান করলাম সুমিষ্ট ঠান্ডা পানি। সুরিয়ের আরামের প্রকৃত হেতুটা জানতে পাই একটু পরে। সে আসলে পরবর্তী প্রায় নয়শ ফুট উড়ন্তি (উপরের দিকে উঠা পথ) দ্রুত পাড়ি দেয়ার জন্য শক্তি সঞ্চয় করছিল। কারণ এই পথটুকু ভীষণ জোঁক প্রবণ। দাঁড়ানো  মাত্রই শরীরে সেটে বসে। কি আর করার আমরাও তাই করলাম। অতপর শরীরের সমস্ত শক্তি সামর্থ দিয়ে সুরিয়ের সাথেই পাড়ি দিতে সক্ষম হলাম বিপদজনক পথ।

একে একে সবাই উপরে উঠি আর বিস্মিত হই প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখে। সম্মুখে সম্পূর্ণ ফাঁকা। দিগন্তে মিশে গেছে সারি সারি পাহাড় আর নীল আকাশ। তারই মাঝে চুপটি করে বসে রয়েছে রাইক্ষং লেক। যেন নীল রঙের একটি কাচের টুকরো। চারপাশে গাঢ় সবুজের আস্তরণ। মাঝে দুটি চারটি ঘর। পাহাড়ের কাঁধে পাথরটায় বসে অভিভূত অভিযাত্রী কেবলই ভেবে চললাম- শিল্পীর আঁকা চিত্র সে বহু দূরের কথা। স্বপ্নও এতো সুন্দর হতে পারে না। দুইঘন্টা পর নামতে লাগলাম নিচের দিকে। বোধহয় এক ঘন্টা বিশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম লেকের কাছাকাছি। প্রথমে থাকবার একটি বন্দোবস্ত করে নিতে হলো। তারপর আত্মহারা হয়ে সকলেই নেমে পড়ি লেকের জলের শীতল পরশ নিতে। বাঁশের ভেলায় চড়ে বৈঠার আলতো টানে বিলি কেটে কেটে ক্রমেই মিশে যাই রাইক্ষং লেকের ঝরণার জলের স্নিগ্ধতায়।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ জানুয়ারি ২০১৬/সাইফ

No comments:

Post a Comment