Sunday, 3 January 2016

Famous 3 Writer

সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ লেখক

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
Published:04 Jan 2016   12:04:40 AM   Monday   ||   Updated:04 Jan 2016   11:32:55 AM   Monday
সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ লেখক
ফেরদৌস জামান : ‘কি পশ্চিম বাংলা, কি বাংলাদেশ- সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ লেখক।’ কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্বন্ধে পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী ঠিক এই কথাটিই বলেছিলেন। তিনি আরও বলেছিলে, ‘ইলিয়াসের পায়ের নখের তুল্য কিছু লিখতে পারলেও আমি ধন্য হতাম।’ ৪ জানুয়ারি সেই ইলিয়াসের প্রয়াণ দিবস। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালে, তৎকালীণ ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববাংলার গাইবান্ধা জেলায়। জন্ম গাইবান্ধায় মামার বাড়িতে হলেও তার পৈত্রিক নিবাস বগুড়া সদরের চেলোপাড়ায়। বাবা বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং পরবর্তীতে মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি ছিলেন।

বগুড়া জেলা স্কুল থেকে তিনি মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক, সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর- এই হল ইলিয়াসের শিক্ষাজীবন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে তার কর্মজীবন শুরু হয় করটিয়া সাদত কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সাথে বনিবনা না হওয়ায় মাত্র দুই কি তিন দিন পরেই চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর ১৯৬৫ সালে জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)-এ প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে মিউজিক কলেজের উপাধ্যক্ষ, প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরিচালক, সবশেষে ঢাকা কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। দুটি উপন্যাস, গোটা পাঁচেক গল্পগ্রন্থ আর একটি প্রবন্ধ সংকলন এবং কিছু কবিতা এই নিয়েই তার রচনা সম্ভার।

বাস্তবতার নিপুণ চিত্রণ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক জ্ঞান, গভীর অন্তরদৃষ্টি ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ তার রচনাকে দিয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী সুষমা। শুধু বাংলাদেশের নয় বরং বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র পাশাপাশি চলে আসে যার নাম তিনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। বাংলা সাহিত্যে তার নাম শীর্ষদের সারিতে। বিজ্ঞজনদের মতে সংখ্যায় নয়, গুণগত বিচারে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছেন। উপন্যাস রচনার সময় বাংলায় তার সমতুল্য একজনকেও  পাওয়া যাবে না বলেও তারা মনে করেন। গল্প রচনার ক্ষেত্রে তিনি প্রথাগত পথ পরিত্যাগ করে একেবারেই নিজস্ব একটি ঘরানা তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্মের মাত্র চার বছরের মাথায় উপমহাদেশের ইতিহাসে ঘটে যায় একটি বৃহৎ ঘটনা। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয় ভারত, যা এই অঞ্চলের মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেয় সম্পুর্ণ নতুন এক পরিস্থিতির মুখে। স্বাধীনতার নামে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়ে যায় ঠিকই, তবে অমানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে দুই বাংলার হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়। ইলিয়াসের রচনাসমগ্রে যার গভীর প্রভাব লক্ষ করা য়ায়। ষাটের দশকে তিনি যখন লেখালেখি শুরু করেন, বলা যায় ততদিনে বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্প সাবালকত্ব অর্জন করে ফেলেছে। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাল পেরিয়ে আবির্ভাব ঘটে গেছে আধুনিক উপন্যাসের। এ ক্ষেত্রে অবশ্য তিন বন্দ্যোপাধ্যায়- বিভূতিভূষণ, মানিক ও তারাশঙ্করের পাশাপাশি সৈয়দ ওয়ালীউল্লা’র নাম উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে এই তালিকায় পরের নামটি হিসেবে যুক্ত হয় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নাম।

জীবনের ছবি নয় বরং জীবনের অভিজ্ঞানই যদি হয় উপন্যাসের মর্মকথা তাহলে সেই অভিজ্ঞান লেখনিতে কীভাবে তুলে আনা যেতে পারে? এই প্রসঙ্গে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের বক্তব্য এ রকম যে : ‘একমাত্র সজ্ঞান ও সচল প্রয়াস ছাড়া সেই শিল্পসিদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছিল সেই সচেতন অভিপ্রায়, যা খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর উপন্যাস দুটিতে।’ পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা যখন ব্যক্তিকে আমুন্ডু গিলে ফেলেছে তখন সেই ব্যক্তির ওপর ভর করে উপন্যাস লেখা হবে কীভাবে? এমন শূন্যতার মাঝে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস উপন্যাসের সাহিত্যতত্ব ও উপন্যাসের বুর্জোয়া ধারা কোনোটা থেকেই সাহায্য পাননি, এমনকি পূর্বসুরী বাংলা ঔপন্যসিকদের কাছ থেকেও নয়। এই পরিস্থিতিতে উপন্যাস রচনায় বিকল্প পথের ধারণাটা তিনি অর্জন করেছিলেন ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার কথাসাহিত্য থেকে। যার ফলে তাঁর উপন্যাস দুটিতে ব্যক্তি এবং ইতিহাস কোনটিই নয় বরং জনপদই হয়ে ওঠে নায়ক। লক্ষণীয় বিষয় হল, তার উপন্যাসে সামাজিক জীবন এবং ব্যক্তির জীবনযাপনের যে সূক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম গতিশীল বর্ণনা পাওয়া যায়, বাংলা সাহিত্যে তার পূর্বসূত্রতার সন্ধান মেলে কেবল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনার মাঝে। একই সাথে তার উপন্যাসে প্রভাব পড়েছে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মহাকাব্যিক মেজাজ। প্রবাদ-প্রবচন, লোককথা, কিংবদন্তি, পূরাণ আর সমাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার মাঝে অবিমিশ্র হয়ে গিয়েছে সমাজ ও রাজনীতি।

বাংলা কথাসাহিত্যে সামগ্রিক রূপটি হলো, মধ্যবিত্ত এর রচয়িতা আর সে মধ্যবিত্তই তার পাঠক। সুতরাং সাহিত্যের অন্যান্য শাখার ন্যায় ছোটগল্পেও মধ্যবিত্তের রুচি আর মনমানসিকতাই প্রতিফলিত হয়ে আসছে। কখনও কখনও  নিম্নবিত্ত শ্রমিক, কৃষকের জীবনকে ছুঁয়ে গেলেও শেষ বিচারে তা মধ্যবিত্তের গণ্ডির মধ্যেই আবদ্ধ থেকেছে। উপন্যাসের ন্যায় ইলিয়াসের গল্পগুলিও  প্রচলিত ঘরানার বিপরীত দিক থেকে রচিত। যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রচলিত গণ্ডিটি তিনি ভাঙলেন। মধ্যবিত্তের রুচি আর দেখার চোখকে বদলে দিতে সচেষ্ট হলেন, যা তিনি পেরেছেনও। তিনি নেমে এসেছেন নিম্নবিত্তের সেই স্তরে, যেখান থেকে তার চরিত্রগুলিকে দেখা যায়, অনুধাবন বা উপলব্ধি করা যায় ঠিক সেখানকার মত করে। নিম্নবিত্তের জীবনকে যে তাদের স্তরে নেমেই প্রত্যক্ষ করা দরকার, সে কথা বুঝতে তার ভুল হয়নি। যার ফলে তিনি আবিষ্কার করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন নতুন এক ভাষারীতি ও বর্ণনাভঙ্গী। এবং প্রকৃত পরিণতিতে গড়ে তোলেন ছোট গল্পের নতুন এক ধারা।

নিম্নবিত্তের জীবন এতটা সৃজনশীলভাবে তুলে আনার বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে ইলিয়াসের জীবনাদর্শের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। যার ছায়া আমরা দেখতে পাই তার ‘সংস্কৃতির ভাঙ্গা সেতু’ নামক প্রবন্ধে। তিনি সেখানে আক্ষেপ ভরা আবেগে বলেছেন, আজ মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। সমাজব্যবস্থা হিসেবে সমাজতন্ত্রের প্রতি তার পক্ষপাত ছিল, যা তার প্রবন্ধে সুস্পষ্ট লক্ষ করা যায়। তার দৃষ্টি মূলত নিবদ্ধ ছিল ব্যক্তি বিকাশের প্রতি। ব্যক্তিমানুষ কীভাবে বিপন্ন, বিপর্যস্ত ও পঙ্গু হয়ে পড়ছে, প্রবন্ধগুলিতে তিনি গভীরভাবে এই জিনিসটিই দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

তার লেখা প্রতিশোধ, অন্য ঘরে অন্য স্বর, খোঁয়ারি, মিলির হাতে স্টেনগান, অপঘাত, জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল প্রভৃতি গল্প বা লেখনিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতার চিত্র। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেন। গোপনে তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন। সংগঠক হিসেবে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির’ এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিমাণের দিক থেকে অত্যান্ত কম লিখেও তিনি বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন। স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেনে লেখক শিবিরের পক্ষ থেকে হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৭), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৭)। খোয়াবনামা উপন্যাসের জন্য ১৯৯৬ সালে আনন্দ পরস্কার ও সাদত আলী আকন্দ পুরস্কারে ভূষিত হন। একই বছর কাজী মাহবুবউল্লাহ স্বর্ণপদক নামে আর একটি পুরস্কার পান। ১৯৯৯ সালে ভূষিত হন একুশে পদক (মরণোত্তর)-এ। প্রকাশিত গ্রন্থগুলি হলো গল্প : অন্য ঘরে অন্য স্বর (১৯৭৬), খোঁয়ারি (১৯৮২), দুধে ভাতে উৎপাত (১৯৮৫), দোজখের ওম (১৯৮৯), জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল (১৯৯৭)। প্রবন্ধের বই মাত্র একটি- সংস্কৃতির ভাঙা সেতু। উপন্যাস দুইটি হল, চিলেকোঠার সেপাই (১৯৮৭) এবং খোয়াবনামা (১৯৯৬)।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখিত আর একটি উপন্যাস প্রায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছিল। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পরিকল্পিত উপন্যাসটির প্রাথমিক রুপরেখা তিনি তৈরিও করে ফেলেছিলেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় মরণঘাতি ক্যান্সার। ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি  ৫৪ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ জানুয়ারি ২০১৬/তারা  

No comments:

Post a Comment