Wednesday, 10 February 2016

Tourism - stay in mountain

Tourism - stay in mountain 

যে কারণে ওরা পাহাড়ের চূড়ায় থাকে

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
Published:10 Feb 2016   03:50:40 PM   Wednesday   
যে কারণে ওরা পাহাড়ের চূড়ায় থাকে
ফেরদৌস জামান : রোদের তীব্রতা থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই থাইক্ষ্যাং পাড়ায় উপস্থিত হয়ে যাই। বম জাতীর বসতি, কারবারী  হাম নং বম সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন তার বাড়িতে। সাজানো গোছানো বসতি, ঝরনা থেকে পাইপ দিয়ে পানির সরবরাহ করা হয়েছে। ঝরঝরে একটা গোসলের পর বসল গল্পের আসর- সাথে এক গ্লাস করে রং চা। ওদিকে রাতের খাবার প্রস্তুত হচ্ছ্। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ খাবার ঘর থেকে ডাক আসে। মারফা (শসা জাতীয় এক ধরনের পাহাড়ি প্রজাতীর সবজি)’র শুকনো ছালের তরকারীর সাথে ঝিরি থেকে সংগ্রহ করা ছোট ছোট শামুকের একটি পদ। প্রত্যেকের সামনে বাটিতে রাখা শামুক।

দু’এক গ্রাস ভাতের পর একটা করে শামুকের মাংস খাওয়ার অভিজ্ঞতাটা ছিল একেবারেই নতুন। সজারুর কাঁটার চোখা মাথার হালকা খোঁচাতেই বেরিয়ে আসে নরম তুলতুলে মাংস।

সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায়, সূর্য ইতিমধ্যেই দাঁত বের করে তার কটকটে রোদ ছড়ানো শুরু করে দিয়েছে। জঙ্গলের পর পরিত্যাক্ত জুম ক্ষেত। ক্ষেতের ঘাসগুলি কখনও কখনও এক মানুষ পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। তার মাঝ দিয়েই ট্রেইল। রোদের মধ্যে এমন পথে ট্রেকিং করা কষ্টসাধ্য। ঘাসের খড়খড়ে ধারালো ডগার আঁচড়ে হাত পায়ের অবস্থা নাকাল। গরমও প্রচুর। তাই আগে খানিকটা জিরিয়ে নিলাম। এমন পরিবেশে ধীর কদমে কাছে আসে তিন-চারটি কিশোর, তাদের হাতে গাছের ছালের দড়িতে ঝুলানো এক ধরনের পোকা। দা দিয়ে খুঁড়ে সেগুলি ধরতেই তারা জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। লবণ, মরিচ দিয়ে রান্না করে খেতে নাকি ভীষণ মজা। বৃত্তান্ত শোনার পর পোকার ছরি হাতে তাদের কয়েকটা ছবি তোলায় তারা অনেক খুশি। সেই খুশিতে অবশ্য মজে থাকার উপায় নেই। কারণ বেশি দেরি করলে সূর্য মাথার ওপর চলে আসবে। তাতে এই পথে হাটা অধিক কষ্টকর হয়ে উঠবে।
 

ওদের কথা মতো বিরতিতে ইতি টেনে এক টানে প্রায় দেড় হাজার ফুট নেমে যাই। উপস্থিত হই এক খালের পাড়ে। খরস্রোতা খাল পার হওয়ার জন্য নিকটেই ছিল একটি বাঁশের সাঁকো, লক্ষ না করার দরুণ স্রোত কেটেই ও-পাড়ে যেতে হয়েছে। খালে গোসলের পর পথ পুনরায় উপরের দিকে উঠে গেছে। খাল থেকে শুরু করে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার পথ মাড়িয়ে উপস্থিত হতে হলাম কাঙ্খিত পাড়ায়। এই দীর্ঘ পথে মেলে মাত্র একজন মানুষের দেখা। পঁচিশ বছরের যুবকটি মিয়ানমার থেকে ফিরছে। কুকি সম্প্রদায়ের এক মিটিং শেষে বাড়ির দিকে রওনা করেছে। দারুণ ব্যাপার তো, মিটিং মিয়ানমারে আর গিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে! বিষয়টি সম্বন্ধে দু’কথা  না জেনে তো ছেড়ে দেয়া যায় না। আমাদের কৌতূহল দেখে তিনিও জানাতে প্রস্তুত- কুকি কোন একক জাতির নাম নয় বরং এর অভ্যন্তরে রয়েছে চার-পাঁচটি জাতিসত্তা। বম জাতিসত্তাও এর অন্তর্গত। বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের পার্বত্য এলাকায় যত কুকির বাস তাদের একটি যুব সংগঠন রয়েছে। বছরে তাদের দুই থেকে তিনটি মিটিং হয়ে থাকে, যাতে অত্র এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে তাকে যেতে হয়। পরবর্তী বসতি অর্থাৎ আমাদের গন্তব্যে যেতে কতক্ষণ লাগতে পারে জানতে চাইলে দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, ত্রিশ মিনিট।
 

দেড়-দুই ঘণ্টা পেরিয়ে যায় কিন্তু তার সেই ত্রিশ মিনিট আর শেষ হতে চায় না। এদিকে ব্যাগে রাখা পানির মজুদ শেষ! বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে। পার্বত্য  রেঞ্জের ঠিক চূড়া ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। উভয় পাশের উপত্যকার পর ঐ দূরে পাকা ধানের বিস্তর জুম ক্ষেত। একটা পর্যায়ে চিন্তিত হয়ে যাই- রাত হয়ে গেলে আর এগুনো যাবে না, থেকে যেতে হবে সেখানেই। শুকনো খাবার ব্যাগে যা আছে তাতে এক রাত কেন, কয়েক দিন পার করে দেয়া সম্ভব, কিন্তু বিপত্তি হলো, কারও কাছে এক ফোটা পানিও অবশিষ্ট নেই। সে কথা ভেবে পেছনে খাল পর্যন্ত যে ফিরে আসব সে পরিস্থিতিও নেই। এরই মধ্যে পিঠে মারফা ভর্তি ঝুরি নিয়ে কোত্থেকে উদয় হয় এক জুম চাষী। তাকে দেখার পর ব্যাগে পানি না থাকলেও অন্তরে পানি চলে আসে সাথে সাথে। সমূহ বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার সম্ভাবনায় অমাদের উৎফুল্ল চেহারা দেখে তিনি থমকে যান। সবকিছু শুনে নিশ্চিত করেন, সামনে অনুচ্চ পাহাড়টির পর জুম, ঠিক তার পর বমদের পাড়া।
 

দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দেখি জুম ঘর থেকে এক কৃষক সবে তার পরিবার নিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। দেখে তারাও দাঁড়িয়ে পড়ে। তাদের তিন-চার বছরের দুই সন্তান আমাদের সাজ পোশাক ও ব্যাগ দেখে ভয়ে চিৎকার শুরু করে দেয়। এদিকে ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। উপস্থিত দাওয়াত পেয়ে বসে পড়ি। দা দিয়ে কচাকচ কেটে দেন কয়েকটা মারফা। ক্ষুধা নিবারণ ও পানির তেষ্টা দুটোই মিটল। তারপর জুম চাষী পরিবারের সাথে পথ ধরলাম। এর মধ্যে বাচ্চা দুটোর ভয় কেটে গেছে। এ পর্বেও বলা হলো পাড়া পর্যন্ত পথ পাঁচ মিনিটের অধিক নয়। বাস্তবে সময় লেগে গেল চল্লিশ মিনিট। পার্বত্য  এলাকায় একাধিকবার যাতায়াতের অভিজ্ঞতায় একটি বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা হয়েছে যে, সময় সম্বন্ধে তাদের সাথে আমাদের হিসেবটা বরাবরই বিরাট একটা ফারাক থাকে। উঁচুতে ওঠার প্রচণ্ড কষ্টে এক পর্যায়ে জানতে চাই, তাদের বসতির অবস্থান পাহাড়ের চূড়ায় কেন হয়? জুম চষী চমৎকার একটি তথ্য দিয়ে আমাদের তথ্যের ঝুলি সমৃদ্ধ করলেন। তিনি জানালেন, বম, ত্রিপুরা, মুড়ং ও খুমি জাতির মানুষেরা উঁচুতে থাকতে পছন্দ করে, পক্ষান্তরে চাকমা এবং মারমারা নদী, খাল বা ঝিরির আশপাশে থাকতে বা বসতি গড়তে পছন্দ করে। আলাদাভাবে যা তাদের স্ব-স্ব সংস্কৃতিরই অংশ।
 

পাড়ায় গিয়ে মেলে এক দল শিকারীর সাক্ষাত। এক সপ্তাহের অধিক হয় তারা বনের গভীরে ঘুরে ঘুরে শিকারে ব্যস্ত। নিকটে কোন মিলিটারি ক্যাম্প না থাকলেও পাড়ার মাথার ওপর একটি হেলিপ্যাড রয়েছে। মসৃণ ঘাসের সমতলে হেলিপ্যাড শিকারী দলের সাথে চললো রাত দশটা পর্যন্ত এক লম্বা আড্ডা। তারপর তাদেরই সাথে খাওয়াদাওয়া। পরের দিন সকালে তারা চললো তাদের উদ্দেশ্যে আর আমরা ‘লুং ফ্যার ভা’র পথে। আমাদের এই পর্বের পথপ্রদর্শক আগের দিন মারফা দিয়ে আপ্যায়নকারী জুম চাষী দাদা। অত্যান্ত সাদাসিধে মানুষ। জুম চাষ এবং শিকার, এটুকুর মধ্যেই আবদ্ধ তার জীবনের গল্প। জীবনের শেষাবধি পরিবারের সদস্যদের মুখে দুটো খাবারের যোগান দিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশাই তার একমাত্র স্বপ্ন। তারা ভেবেই পায় না, আমরা শহর বা সমতলের মানুষেরা কি দেখতে পাহাড়-পর্বতে যাই?

খামাখা এই পরিশ্রমের কোনো অর্থ তারা খুঁজে পায় না। যখন বলা হয় পাহাড় কত সুন্দর! যে সুন্দরের টানেই বারবার ছুটে আসি। প্রতি উত্তরে নিজেদের চলতি ঢঙে তারা বলে- না, পাহাড় ভালো না যে, শুধু কষ্ট! সাথে আরও বলে, সমতলে চলাফেরা সহজ, গাড়িঘোড়া কত কি আছে! খাওয়ার জন্য এত কষ্ট করে চাল উৎপাদন করতে হয় না। এই সমস্ত গল্প করতে করতে সামনে পড়ে একটি জুম ঘর। ঘরটায় ব্যাগ রেখে জুমের মাঝ দিয়ে ত্রিশ মিনিট নিচে নেমে শুনতে পাই দূর থেকে ভেসে আসা ঝরনার ছর ছর শব্দ। অন্ধকার, তারওপর চারপাশ নিস্তব্ধ, গাছপালা ঢাকা হিম শীতল জায়গা, জনমানুষের চিহ্নটি নেই। ঝরনার শব্দের সাথে কেবল মিশে যাচ্ছে দূর থেকে ডাকা  দু’একটা অপরিচিত পাখির কিচিরমিচির শব্দ। অভিযাত্রীদের নজরে ‘লুং ফ্যার ভা’ এখনও সেভাবে আসেনি। এলেও সকলের পক্ষে যে সেখানে যাওয়া সম্ভব হবে তা বলা যায় না। কারণ পথ অনেক কঠিন এবং কষ্টকর। সুন্দর একটি ঝরনা তবে বর্ষায় বা ঠিক তার পর পর না যেতে পারার দরুণ প্রকৃত সৌন্দর্য থেকে অনেকটাই বঞ্চিত হয়েছি। সুতরাং আগেই বলে রাখছি, যারা যাবেন তারা বর্ষাতেই যাবেন।
 http://www.risingbd.com/%E0%A6%AF%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A3%E0%A7%87-%E0%A6%93%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9A%E0%A7%82%E0%A7%9C%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%A5%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%87/146690



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬/তারা

No comments:

Post a Comment