Wednesday, 9 December 2015

Bangladesh Tourism and Festival

Bangladesh Tourism and Festival :



প্রিয়জনকে বিজয় দিবসের স্মারক উপহার

সুদীপ দেবনাথ রিমন : রাইজিংবিডি ডট কম
Published:14 Dec 2015   02:14:59 PM   Monday   ||   Updated:14 Dec 2015   05:32:34 PM   Monday
ফটোগ্রাফি: অপূর্ব খন্দকার

ফটোগ্রাফি: অপূর্ব খন্দকার

সুদীপ দেবনাথ রিমন : ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিনটি গৌরবময় ইতিহাসের দিন। কারণ দীর্ঘ নয় মাস রক্ত সংগ্রাম এবং ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই দিনে আমরা অর্জন করেছি বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও নিজস্ব একটি পতাকা।

সেই থেকে প্রতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর দিনটিকে আমরা বিজয় দিবস হিসেবে পালন করে থাকি। আর এখন চলছে আমাদের বিজয়ের ডিসেম্বর মাস, আনন্দের মাস। তাই বিজয়ের আনন্দ উদযাপনের জন্য আমরা বাড়ীর আঙিনায় টানানোর জন্য কিনতে পারি অনেক বড় লাল সবুজের পতাকা কিংবা অফিসের টেবিল, গাড়িতে ও হাতে নিয়ে ঘুরার জন্য ছোট পতাকাগুলো।

বিজয়ের আনন্দ প্রিয়জনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য উপহার হিসেবেও দিতে পারেন পতাকা। মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় দিবসের চেতনাকে হৃদয়ে লালন পালন করার জন্য পতাকার চেয়ে ভালো কিছু উপহার নেই। বড় সাইজে একটি পতাকার দাম পড়বে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা। মাঝারি সাইজের পতাকা মিলবে ৫০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে। এছাড়া ছোট পতাকা পাওয়া যাবে ১০ থেকে ২০ টাকার মধ্যে।

এছাড়া বিজয় দিবসের আকর্ষণীয় উপহার হিসেবে দিতে পারেন নানা ধরনের স্মারক। ফ্যাশন হাউজগুলোতে স্বাধীনতার স্মারক হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে শাড়ী, ফতুয়া, টি-শার্ট, পাঞ্জারি, চাবির রিং, মগ, কার্ড প্রভৃতি কিছু। মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি ও বই কিংবা দেশের গানের অডিও/ভিডিও সিডিও রাখতে পারেন উপহারের তালিকায়।

ফ্যাশন হাউজ ‘সাদা কালো’ এর সত্ত্বাধিকারী ও ডিজাইনার তাহসিনা শাহীন বলেন, স্বাধীনতার স্বাদ তো আমরা বিভিন্ন ভাবেই নিতে চাই আর এই বিশেষ দিনটাকে মনে রাখতেই কাছের মানুষকে ছোট কোনো স্মারক উপহার দেয়া যেতে পারে। আমাদের এখানে পাওয়া যাচ্ছে বিজয় দিবসের টি-শার্ট, মগ, ‘সাদা কালো ৭১’ নামে মুক্তিযুদ্ধের ওপর আঁকা ৫০ জন চিত্রশিল্পীর ছবি নিয়ে সংকলিত বই। এই বই নতুন প্রজন্মের কাছে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট কিছুটা হলেও তুলে ধরতে সহায়ক হবে বলে মনে করেন তিনি।

ফ্যাশন হাউজ বাংলার মেলা’র ডিজাইনার ও স্বত্ত্বাধিকারী এমদাদ হক বলেন, স্বাধীনতা কিংবা বিজয় দিবসে যে নতুন পোশাক পড়তেই হবে তেমন কোনো কথা নেই, আবার স্মারক রঙ লাল সবুজ হতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই। তবে জাতীয় পতাকার সঙ্গে মিল রেখে অধিকাংশ স্মারকের ডিজাইন তৈরি করা হয়।

ফ্যাশন হাউজ রঙ-এ মিলবে স্বাধীনতার বেশ কিছু স্মারক। স্মারকগুলো সবই লাল সবুজের আবেশে মোড়ানো। শাড়ি কেনা যাবে ১২০০ টাকায়, পাঞ্জারি ৫২০-৬০০ টাকায়, মেয়েদের কুর্তা কেনা যাবে ৫৫০ টাকার মধ্যে। ছেলেদের জন্য পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে পংক্তি-সংবলিত টি-শার্ট কেনা যাবে ৩৫০ টাকায় আর একই ডিজাইনের ফতুয়া ৬০০ টাকায়, মগ কেনা যাবে ২৫০ টাকায়, দেশের গানের সিডি কেনা যাবে ৯০ টাকায়।

ফ্যাশন হাউজ বাংলার মেলা থেকে পাঞ্জাবি কেনা যাবে ৬৭০ থেকে ৭৫০ টাকায়। ছেলে মেয়ে উভয়ের ফতুয়া কেনা যাবে ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকায়, শিশুদের জন্য লাল সবুজের বর্ণিল ফতুয়া ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকায়, মগ কেনা যাবে ২২০ থেকে ২৫০ টাকায়।

ফ্যাশন হাউজ নিত্য উপহারে টি-শার্ট কেনা যাবে ১৮০-৪২০ টাকায়। চাবির রিং কেনা যাবে ৩০ টাকায়।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আয়োজনে রয়েছে মগ, টি-শার্ট, চাবির রিং, কার্ড, গানের সিডি।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ ডিসেম্বর ২০১৫/ফিরোজ

চোখ জুড়ানো সুন্দর তেরাং তৈ কালাই

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম.
Published:13 Dec 2015   05:27:10 PM   Sunday   
চোখ জুড়ানো সুন্দর তেরাং তৈ কালাই 
ফেরদৌস জামান : বিয়ের অনষ্ঠানে এসে কি আর প্রকৃতির স্বাদ গ্রহণের বাসনা পূরণ হয়? তবুও ইচ্ছা যদি দৃঢ় ও পোক্ত হয়ে থাকে তাহলে কিছু একটা করা তো অবশ্যই সম্ভব। ইতিমধ্যেই দুই দিন পেরিয়ে গেছে, হাতে আছে মাত্র এক দিন। খাগড়াছড়ি গিয়ে তেরাং তৈ কালাই না দেখে ফিরে আসা মানে ভ্রমণ অর্থহীন- ঢাকা থেকে বন্ধুদের এমন সব কথা শুনে আর বসে থাকতে পারলাম না।

ব্যাস্ততা যতই থাক, সেখানে না গিয়ে ঢাকা ফিরছি না- সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। বিয়েবাড়ির কেউ তেরাং তৈ কালাই সম্বন্ধে ভালোভাবে জানে না। অথচ একেকজনের মুখ থেকে বেরুচ্ছে নানান সব নিরুৎসাহের উপদেশবাণী। ওদিকে বৃষ্টিও যেন বেরসিক হয়ে উঠল। হোক গে আমার ছিচকাদুনে বৃষ্টি, থাক গে পড়ে বিয়েবাড়ি। আমি চললাম ঝরনা দেখতে। শহর পেরিয়ে গাড়ি এগিয়ে চললো মাটিরাঙ্গা উপজেলার দিকে। উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ, গাড়ির পেছন দিয়ে গরম বাতাস যা বেরুনোর তা তো বেরুলোই, এক সময় মনে হলো গাড়ি বুঝি এবার পেছন দিকে চলা শুরু করবে! হেলপারকে আগে থেকেই ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা ছিল। কথা অনুযায়ী নামিয়ে দিল একেবারে জায়গা মত। বৃষ্টি ঝরছেই, হাঁটতে হবে দুই দশমিক এক শূন্য কি.মি.।

ব্যাগে ছাতা বা পলিথিন জাতীয় কিছুই আনা হয়নি। ইট বিছানো উঁচু-নিচু পথ, অল্প খানিকটা হাঁটার পর টিপরাদের পাড়া (ত্রিপুরা), ছোট্ট ছাউনির নিচে আশ্রয় নিয়ে ভাবছি, কী করা যায়? দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যেই কোত্থেক এক মাইক্রোবাস এসে হাজির। ব্রেক কষে বলল, ঝরনা কতদূর, কতক্ষণ লাগবে, গাড়ি নিয়ে কতটা পথ যাওয়া সম্ভব? ইত্যাদি। এই তো সুযোগ! যে করেই হোক কাজে লাগাতে হবে। আমিও যে একই গন্তব্যের পথিক, বুঝিয়ে দেয়ার পর স্বসম্মান আহ্বানে উঠে পড়ি গাড়িতে। আমেরিকা অধ্যায়নরত ভাগিনাকে ঝরনা দেখাতে নিয়ে এসেছে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মামা। মূহূর্তেই আমাকে তারা আপন করে নিলেন। আলাপ হলো ভাগিনা শাওন ও অন্যান্যদের সাথে। নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত গিয়ে ঢালু পথের আগেই গাড়ি রেখে পায়ে হেঁটে চললাম।



পথের সর্বশেষ এবং একমাত্র ঘড়ে কড়া নাড়তেই বেরিয়ে এলেন খর্বাকৃতির রবীন্দ্র ত্রিপুরা। অল্প কথার এক পর্যায়ে নিজ থেকেই তিনি আমাদের গাইড হলেন। খানিক এগিয়েই ঝরনার ছরছর শব্দ কানে ধরা দিল। রবীন্দ্র ত্রিপুরা জানান, তেরাং তৈ কালাই ত্রিপুরা শব্দ, যার অর্থ ‘উঁচু পাহাড় আর জল পড়া’ এমন কিছু একটা হয়ে থাকবে। ঝরনার অপর নাম রিসাং। মারমা শব্দ রিসাং। এর অর্থ পাহাড় থেকে পানি পড়া। অর্থ যাই হোক, সে নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা নেই, কারণ জল পড়া বা পানি পড়া এমন কিছুর বাইরে অন্য কোনো কিছু যে হবে না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত। শুরু হল পাহাড় আর জঙ্গল। চোখ জুড়ানো সুন্দর! পাহাড় চূড়ায় জুমঘর, জুমের কচি ফসলে ভরে রয়েছে পাহাড়ের সারা শরীর। মেঘ এসে ক্ষণে ক্ষণে কোমল পরশে সিক্ত করে যাচ্ছে জুমক্ষেত। এ দিকে নিজেদের শরীরের সমস্ত ক্লান্তি যেন নিমিষেই বিদায় নিল।

পার্বত্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে নির্মিত পথের শেষ প্রান্ত থেকে মজবুত সিঁড়ি নামিয়ে দেয়া হয়েছে ঝরনাধারায় সৃষ্ট ছড়ার গোড়ালি পর্যন্ত। সিঁড়ির ওপর থেকেই চোখে পড়ে ঘন সবুজের ফাঁক গলিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসা রূপবতী তেরাং তৈ কালাই। যেন দীর্ঘ থান থেকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে সাদা ধবধবে কাপড়। আহা, ঠান্ডা পানি! ঝরনার নেমে আসা পানিতে পা ডুবিয়ে পাথরে পাথরে কদম ফেলে পেরিয়ে গেলাম ছড়া। প্রায় ৪৫ ডিগ্রী কোণ করে নেমে আসা কালো মসৃণ পাথরের মেঝে, একেবারে তার মাথায় ঝড়ে পরছে ওপর থেকে ছেরে দেয়া পানি। পিচ্ছিল মেঝে মাড়িয়ে উঠে যাই ওপরে। শাওনের ইচ্ছা- ঝরনার পানিতে সরাসরি গা ভেজাই। শ্যাওলা পড়া অতি পিচ্ছিল মেঝেতে খুব সাবধানে পা ফেলে এক পা, দুই পা করে হাজির হতে সক্ষম হলাম ঝরনার নিচে।



এবার আমার ইচ্ছা- বসে পড়ে শরীরটা ছেড়ে দেই যতক্ষণ না ছড়ায় গিয়ে পরি। সাহসী শাওনের সে বাসনা যে ছিল না, তা নয়। ওদিকে আমাদের গতিবিধি সুবিধাজনক না ঠেকায় মামা চিৎকার করে বারণ করতে থাকলেন এবং তাড়াতাড়ি উঠে আসার জন্য বললেন। পানি পতনের শব্দে তার কথা না শুনতে পারলেও বুঝে নিতে সমস্যা হল না তিনি কি বলছেন। অমন পরিস্থিতিতে কে শোনে কার কথা! অমনি বসে পড়ে শরীরটা দিলাম ছেড়ে। কয়েক সেকেন্ডে এসে মিশে গেলাম ছড়ার স্রোতে। অর্জনের উল্লাসে প্রকম্পিত হল চারদিক। অন্যরা উৎসাহ জোগাল- আর একবার করো না প্লিজ! সাহস তো হয়েই গেছে অতএব, চললো কিছুক্ষণ। অতঃপর মামার ধমকানিতে এবার সত্যি সত্যিই উঠে পড়তে হল।

ঝরনায় আসবার সময় পথের অনেকটাজুড়ে বিশেষ করে ছড়ার পাশে পড়ে থাকতে দেখেছিলাম অসংখ্য হাফপ্যান্ট, থ্রি-কোয়ার্টার ও ফুলপ্যান্ট। নানা রঙের একেকটা প্যান্ট। হেতুটা বুঝে উঠতে পারিনি! ফেরার সময় সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠার এক পর্যায়ে পেছন থেকে কানে আসে খিল খিল হাসির শব্দ। হাসতে হাসতে গলে পড়ছে শাওনের ছোট্ট মামাতো ভাইটা। পেছনে হাত দিয়ে দেখি প্যান্ট তো গেছে, সাথে ভেতরেরটাও! খাবলা ধরে উঠে যাওয়ার মত। শুধু আমরা নই, যারাই উপরুল্লেখিত কর্মটা করে, তাদের সকলের ক্ষেত্রে একই পরিণতি হয়ে থাকে। অতঃপর খুলে ফেলে রেখে যায় সেখানেই।



ভাবলাম সবকিছু বাদ দিয়ে তেরাং তৈ কালাই- এর নিচে প্যান্টের দোকান দিয়ে বসলে মন্দ হয় না। রবীন্দ্র ত্রিপুরার ঘড়ে এসে শরীর শুকিয়ে নিতে নিতেই পরিবেশিত হল ধোঁয়া তোলা বঙিন চা। ঘড়ের সাথে তার ছোট্ট একটা দোকান, স্বামী-স্ত্রী মিলে চলান। মেঘ মাখা আকাশে থেকে থেকে বিদ্যুতের ঝলক, ওদিকে সূর্যাস্তের আবির রং ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের পেছনে। রাস্তার মোড়ে এসে আমাকে তারা নামিয়ে দিয়ে চললো চট্টগ্রামের দিকে। গাড়ির জন্য অপেক্ষা না করে সবুজের মাঝে এঁকেবেঁকে চলা কালো পথ ধরে হাঁটতে থাকলাম। সন্ধ্যা নেমে পড়ছে দ্রুত, পেয়ে গেলাম বিকট শব্দে আসা ভাঙ্গাচোড়া এক চান্দের গাড়ি। চন্দ্রবাহনে সওয়ার করে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে দু-একটা সন্ধ্যাতারার উঁকিঝুকি দেখতে দেখতে কখন যে প্রবেশ করলাম আলো ঝলমলে বিয়ে বাড়ির সামনে  বুঝতেই পারলাম না।

  রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ ডিসেম্বর ২০১৫/তারা
A Journey to Barisal  by Rocket

রকেটে চড়ে বরিশাল

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
Published:26 Nov 2015   04:56:02 PM   Thursday   ||   Updated:06 Dec 2015   06:00:22 PM   Sunday
রকেটে চড়ে বরিশালফেরদৌস জামান : একদিন হঠাৎ এক বিকেলে সংবাদ পাই পরশুদিন বরিশাল যাওয়া হচ্ছে। রকেটের টিকিট কাটা হয়ে গেছে। বিশেষ ব্যাবস্থায় শাওন বিআইডাব্লিউটিএ’র মতিঝিল কার্যালয় থেকে পাঁচটি টিকিট কাটতে সক্ষম হয়েছে। সহজে নাকি টিকিট মেলে না। কখনও কখনও ওজনদার রেফারেন্সেরও প্রয়োজন পড়ে, তা স্বাভাবিক- রকেট বলে কথা! তখনও জানি না, কে কে যাচ্ছি? নির্দিষ্ট তারিখে টঙ্গী থেকে রওনা দেই, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে পৌঁছতে যেখানে কমপক্ষে আড়াই ঘণ্টা সময় লেগে যাওয়ার কথা, সেখানে লাগল মাত্র দেড় ঘণ্টা। গিয়ে দেখি অন্যরা আগেই এসে বসে আছে। অনিক, মাকসুদ, শাওন এবং শুভ। ৪র্থ জনের সাথে সেদিনই প্রথম পরিচয়। জানা মতে রাষ্ট্রের সেবামূলক যতগুলি খাত রয়েছে তার মধ্যে একমাত্র বিআইডাব্লিউটিএ’র রকেটেরই কোনো লোকসান নেই। সরকার চাইলে কথাটি গর্বের সঙ্গে বলতে পারে। সদরঘাট থেকে স্টিমারে চলাচলকারী লোকেরা বাহনটিকে সাধারণত ‘রকেট’ বলে। সব শেষে মাত্র চারটি রকেট চলাচলের উপযোগী ছিল- অস্ট্রিচ্, লেপচা, মাসুদ এবং গাজী (সম্প্রতি বহরে যুক্ত হয়েছে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত নতুন আরও দুইটি)।

ব্রিটিশ আমলে তৈরি স্টিমারগুলো এখনও সেই সাবেকি ঠাঁটেই চলছে। আমাদেরটির নাম ‘অস্ট্রিচ্’। অত্যন্ত পরিপাটি অস্ট্রিচের অভ্যন্তরের পরিবেশ। চারপাশে কেবিন, ঠিক তার মাঝে পুরু গালিচা বিছানো মেঝেতে স্থাপন করা টানা লম্বা একটি ডাইনিং টেবিল। পাশে কয়েকটি সোফাও রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে সার্বক্ষণিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত টিপটপ ব্যবস্থাপনা। সবখানে আভিজাত্যের ছোঁয়া। কেবিনের পেছনে টানা বারান্দা। একেবারে জলের ওপর পর্যন্ত ছড়ানো। বারান্দার মাঝামাঝিতে দুই পাশে দুইটি বিশাল আকারের চাকা। চাকার ওপরের দিকটা প্রায় ছাদ বরাবর উঁচু। স্কুলে পড়তে কোন শ্রেণীতে যেন বাংলা বই-এ এক গল্প ছিল। গল্পের প্রথম পাতাতেই দেয়া ছিল স্টিমারের বড় একটি ছবি। গল্পের চেয়ে গল্পের ছবিটাই বেশি টানতো। ভাবতাম এত্তো বড় নৌকা তাও আবার চাকাওলা! ধরেই নিয়েছিলাম স্টিমার চাকার ওপর গড়িয়ে গড়িয়ে চলে। কিন্তু একটি বিষয় কখনও মেলাতে পারতাম না- নদীর তলদেশ তো সমতল নয়, কোথাও গভীর তো কোথাও উঁচু। তাহলে কীভাবে চলে? এইবার আমার ভাবনার ঘোর কাটল, চাকার মাঝে সংযুক্ত রয়েছে অনেকগুলো প্যাডেল, যার সাহায্যে জল কেটে কেটে রকেট এগিয়ে চলে। সব শেষে সম্মুখের ফাঁকা অংশে টেবিল চেয়ার পাতা। চাইলে আবার ছাদেও যাওয়া যায়, রেলিং দিয়ে ঘেরা সংকীর্ণ দাঁড়াবার জায়গা রয়েছে।
 
নির্দিষ্ট সময় সন্ধ্যা ছয়টায় ছেড়ে দিল অস্ট্রিচ্। চায়ের সাথে ঐতিহ্যের স্বাক্ষর কাঠিতে ফোড়ানো কোরাল মাছের কাবাবে সেরে নেয়া হল সান্ধ্যকালীন নাস্তা। অনিক ও শুভ’র পৈত্রিক বাড়ি বরিশাল, যার সুবাদে আমাদের পক্ষে স্টিমার সংস্কৃতি বুঝে নিতে সহজ হল। রাত সাড়ে নয়টায় খেয়ে নিলাম রাতের খাবার। দেখলাম যাত্রা শুরুর পর পরই সকলে ফ্রেশ হয়ে বসে পড়ল ডাইনিং-এ। চলল দীর্ঘ আড্ডা। এক দল মিশে গেল আরেক দলে অথবা একজন আরেকজনের সাথে। গল্পে গল্পে চলল পেয়ালার পর পেয়ালা চা। গল্পের প্রসঙ্গের কোনো ঠিক ঠিকানা থাকে না। রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে শুরু করে ভূত-প্রেত, হাসি, কৌতুক এমন কি সঙ্গীতের আসর পর্যন্ত! দেখা যায় এই গল্প বা আড্ডার আসর থেকে নতুন পরিচিত অনেকেই পরস্পরের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। পৌঁছে যায় দাওয়াত দেওয়া নেওয়ার পর্যায়ে। তেমনই এক ঘটনা অবশ্য আমাদের বেলাতেও ঘটে গেল।

রাতের খাবারের পর পাঁচ জনে গিয়ে বসি সম্মুখের ফাঁকা জায়গাটায়। ছলাৎ ছলাৎ ছরর ছরর শব্দ উঠেছে দুপাশের প্যাডেল ভর্তি চাকায়। এগিয়ে যাচ্ছে অস্ট্রিচ্। চারদিকে শুধু পানি আর পানি, আশপাশ দিয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছে মিটমিটে রঙ্গিন আলোয় বর্ণিল দু-একটি লঞ্চ। এদিকে অস্ট্রিচ্ চলে একই গতিতে, সহসা গতি পরিবর্তন না করা তার ঠাঁটের অংশ। বাতাসের ঝাপটা অনবরত শরীরে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই ডাইনিং- এ বসে গলা চেপে ধরে গান গেয়ে অস্বস্তি জমা হয়ে রয়েছে, তার ওপর দিয়ে বাতাসের উন্মত্ত খেলা। যে যেভাবে পারি একের পর এক গাইতে থাকি গান। মাঝে মাঝে গল্প। এমনি করে এক পর্যায়ে রাতের সমস্ত গভীরতা এসে যেন লুটে পড়ল খোলা জায়গাটায়। সাথে সাথে গলাও চড়ে গেল উঁচু থেকে আরো উঁচুতে। আমাদের ফাটা বাঁশের মতো হেরে গলার সংগীত চর্চা শুনে এগিয়ে এলেন মাঝবয়েসী দুই যাত্রী। বাবু ভাই এবং ডন ভাই যথাক্রমে ইউএসএ এবং ইন্দোনেশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত দুই ব্যবসায়ী। তারাও টেবিল চাপড়ে সুরে তাল মেলালেন। এভাবেই চলল, রাত প্রায় আড়াইটা পর্যন্ত। ডাইনিং-এ হালকা আলাপ পরিচয় তারপর দীর্ঘ গানের আড্ডা, মাঝ রাতের পর সম্পর্ক গিয়ে ঠেকল তাদের বাড়িতে পর দিন ডিনারের নিমন্ত্রণে। যদিও শেষ পর্যন্ত সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
 
খুব সকালে গিয়ে নামলাম বরিশাল লঞ্চ ঘাটে। আমাদের আরেক বন্ধু সাফিনের বদৌলতে থাকার বন্দোবস্ত হয়েছিল বরিশাল সার্কিট হাউসে। রুমে উঠে হালকা নাস্তার পর দুই ঘণ্টা বিশ্রাম শেষে দ্বিতীয় দফা নাস্তার ডাক পড়ল অনিকের নানাবাড়ি থেকে। বিএম কলেজের একটু আগে ওর নানাবাড়ি। পরোটার সাথে অনেক কিছুর মধ্যে বরিশালের বিখ্যাত রসে টইটুম্বুর গরম রসগোল্লা ও গৌরনদীর দই ছিল অনন্য দুটি পদ। বিকেল বেলা আমাদের নেয়ার জন্য চলে এলেন শুভ’র চাচা। তিনি আমাদের দেখাতে নিয়ে যাবেন শুভ’র বাজার ও কাউয়ার চর। কীর্তনখোলা ঘাটে গিয়ে ভাড়া করা হয় একটি মেশিন চালিত নৌকা। পাশেই দেখলাম প্রস্তত হয়ে আছে সুন্দরবন-৭ ও সুরভী-৮ সহ বেশ কয়েকটি লঞ্চ। সন্ধ্যায় ছেড়ে যাবে ঢাকার উদ্দেশে। কি লম্বা একেকটি লঞ্চ!  তিন চার তলার এই লঞ্চগুলোই রাতে আমাদের অস্ট্রিচকে পেছনে ফেলে চলে এসেছে। ওদিকে ঘাটের অপর পাড়ে একটি জেটিতে লাইটার জাহাজ থেকে মালামাল খালাস করা হচ্ছে।

ফটফট শব্দে চললো নৌকা। তখনও জানি না শুভ’র বাজারে কি দেখতে যাচ্ছি? বংশের প্রথম প্রদীপ হিসেবে নাতির জন্মের সাথে সাথে জোদ্দার দাদা ঘোষণা করেন, অমুক জায়গায় একটা বাজার স্থাপন করা হবে, যার নাম হবে আদরের নাতির নামে- শুভ’র বাজার। প্রত্যন্ত চরের আশপাশ দিয়ে এগিয়ে চললো নৌকা। জলরাশির বুকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে নৌকা থামতে বলা হল। আমরা তো ভাবছি, চাচা ভাতিজা মিলে কী করে? মাঝ নদীতে নৌকা দাঁড় করানো হল কেনো? চাচা খানিকটা আবেগপ্রবণ হয়ে বললেন, এই হল শুভ’র বাজার। পনেরো বছর আগে ভাঙ্গনে বিলিন হয়ে গেছে। সাথে ভেঙে নিয়ে গেছে অনেক মানুষের স্বপ্ন। চায়ের দোকান, কাপড়ের দোকান, তরিতরকারীর দোকান সবই ছিল। মাঝি বলল, তার শ্বশুরেরও একটা দোকান ছিল। পরিবেশটা কেমন ভারি হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ধরতে হল ফিরতি পথ। সন্ধ্যা হয়ে আসায় সেদিন আর কাউয়ার চরে যাওয়া সম্ভব হল না।
 
যথারীতি পর দিনের গন্তব্য কাউয়ার চর। আবারও সেই মেশিনের নৌকা। কীর্তনখোলা পেরিয়ে চরে অবতরণের পর ভাড়া করা হলো তিনটি মোটরসাইকেল। নিয়ে যাবে চরের এ প্রান্ত থেকে ওদিকে সর্বশেষ পর্যন্ত, যেখানে ঢ়াড়িয়ালখা নদীর ঘাট। ভেবেছিলাম চরে অনেক কাক আছে অথবা নামকরণের শানে-নুজুলে থাকবে কাউয়া নামে কোনো লোকের গল্প। না, তেমন কিছুই খুঁজে পেলাম না। ঘন সবুজে আবৃত সম্পূর্ণ চরের বুকে পাতলা বসতি, এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে পিচ ঢালা সরু পথ। চরের বাজারে একটা মধ্যবিরতি দিলাম। সখি বিস্কুটের সাথে চা। হাড্ডির মত শক্ত সখি বিস্কুট চায়ে চুবিয়ে খেতে মন্দ ছিল না। তবে রং চা হলেও স্বাদে খানিকটা অন্যরকম। জানতে চাইলে বিক্রেতা তৃপ্তি ভরা মুখে বললেন, স্পেশাল চা তাই চিনির সাথে দেয়া হয়েছে সমান্য লবনের ছিটা। সময়টি ছিল তালের শাসের মৌসুম। ঢ়াড়িয়ালখা’র ঘাটে গিয়ে মিলল কঁচি তালের এক বিশাল মজুদ। কেবলই নৌকা থেকে নামানো হয়েছে। দাম কত বলতেই ব্যাপারী আমাদের উচ্ছ্বাস দেখে বললেন, আগে খান, কতটা পারেন দেখি। তারপর দাম যা হয় দিবেন।

দুপুরে ভরপেট খাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাদেই নাক ডুবিয়ে তালের শাস খাওয়ায় কেউ ছাড় দিতে নারাজ। এমনিতেই এই জিনিসটি অতিরিক্ত খেলে শরীর ঢুলু ঢুলু করে। বরিশালের মাটি স্পর্শ করার পর থেকেই খাওয়ার ওপর আছি। সন্ধ্যায় বিএম কলেজ রোডে নিতাইয়ের দোকানে হানা দেয়া হল। ছোট ছোট সাইজের রসগোল্লা, এই দোকানের রসগোল্লার খবর আমাদের আগে থেকেই জানা ছিল। সুতরাং নিতাইয়ের গরম রসগোল্লা ভক্ষণের ক্ষেত্রেও নাক আর শুকনো রাখা গেল না, এখানেও নাক একেবারে ডুবিয়ে খাওয়া! অবশেষে শুভ’র চাচার বড়ি বাদশাহী ডিনার শেষে সার্কিট হাউসে ফিরতে ফিরতেই শাওনের তো যায় যায় অবস্থা! লাইন ডাইরেক্ট হলে যা হয় আর কি। পরের দিন দুপুর পর্যন্ত এক পাশের বিশেষ ছোট ঘরটা ওর জন্যই বরাদ্দ রাখা হল। বেচারির চোখ এরই মধ্যে গর্তে প্রবেশ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ভ্রমণ পরিকল্পনার দু-একটি আকর্ষণ বাদ রেখেই ঢাকার পথে রওনা দিতে সন্ধ্যায় আবার উঠে বসলাম রকেটে।

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ নভেম্বর ২০১৫/তারা

 

বিপজ্জনক ট্রেইল ধরে কংদুকত্লাং বিজয়

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
Published:06 Dec 2015   06:06:30 PM   Sunday   ||   Updated:09 Dec 2015   03:05:42 PM   Wednesday
বিপজ্জনক ট্রেইল ধরে কংদুকত্লাং বিজয়
ফেরদৌস জামান : দেশের ঋতুবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পর্বতারোহণের জন্য উপযুক্ত সময় নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে। অপরদিকে ঝরনা অথবা প্রকৃতির সবুজ সতেজতা উপভোগের সর্বোত্তম সময় জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। সুতরাং অভিযাত্রীদের প্রায় সকলেই উল্লেখিত সময় দুটির জন্য অধির আগ্রহে থাকে। দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কংদুকত্লাং বা জগিহাফং সম্বন্ধে অবহিত হই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জওত্লাং অভিযানের সময়।

ইচ্ছা এবং সময় উভয়ই ছিল কিন্তু বিশেষ করে আমার শারীরিক অবস্থা উপযুক্ত না থাকায় তখন নতুন গন্তব্যের চিন্তা মাথা থেকে ঝেরে ফেলতে হয়েছিল। জওত্লাং অভিযানের সময় স্যাঁতসেতে ঢালু পাথুরে পথে পিছলে গিয়ে আমার দুই হাটু ও কনুইয়ে আঘাত লেগেছিল। বেজক্যাম্পে দুই দিন বিশ্রাম করে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছিলাম। মৌসুম তো আর কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সুতরাং দুই সপ্তাহ পর আবারও রওনা হই পাহাড় ও প্রকৃতির আহ্বানে।

বরাবরের মত অভিযানের ভিন্নতা ছিল তার ধরনে। যেমন লক্ষ্যে পৌঁছা বা জয় করার তাড়নায় ডানে-বামে না তাকিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য মনের মত করে না দেখে দুরন্ত গতিতে কেবল নিষ্প্রাণ ট্রেকিং করা নয়, আমি বরং যাত্রাপথের চারপাশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। উল্লেখিত উদ্দেশ্য থেকে অভিযানের পরিকল্পনায় সড়ল ও প্রচলিত পথে নয় বরং বিকল্প অথচ দীর্ঘ পথ বেছে নিলাম।

কংদুকত্লাং এর পরিচয় হলো, কংদুক মারমা শব্দ, যার অর্থ ন্যাড়া, সাথে যুক্ত হয়েছে বম শব্দ ত্লাং, অর্থ পাহাড়। দুয়ের যোগফল ন্যাড়া পাহাড়। শৃঙ্গটির অপর নাম জগিহাফং। ত্রিপুরা এই শব্দের অর্থও ন্যাড়া পাহাড়। জগি বলতে তারা ঠাকুরও বুঝায়। অতএব, সম্মানার্থে ত্রিপুরাগণ ‘ঠাকুর পাহাড়’ বলেও সম্বোধন করে। অবস্থান বান্দরবান জেলাধীন বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে। শেরকোড় পাড়া হয়ে ট্রেইল ধরতে হলো ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ডটংপাড়া অভিমুখে। পরিচিত বসতি, গত একাধিক অভিযানে পাড়াটির মাঝ দিয়ে অনেকবার গিয়েছি। ঝিরিপথে ওঠা-নামা যে একেবারেই নেই তা নয়, পাহাড় শীর্ষে পাড়ার অবস্থান, ওঠার জন্য তৈরি হয়েছে বিকল্প পথ। পূর্বের পথ (তুলনামূলক সহজ) পরিত্যাক্ত হয়েছে কুসংস্কারজনিত একটি কারণে-বছর দুই আগে অজানা রোগে পাড়ার এক কিশোরীর মৃত্যু হলে তাকে কবর দেয়া হয় পথের পাশে। তারপর থেকেই পাড়ার লোকজন নাকি ভূতপ্রেত দেখা শুরু করে।



যাই হোক, খাঁড়া ট্রেইল বেয়ে ওপরে উঠে আশ্রয় মিলল তাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি বাংলা জানা এক বৃদ্ধের ঘরে। ব্যাগ থেকে স্যুপ ও নুডলস্ বের করে রান্না করা হলো। অচেনা অদেখা খাবার রান্না করা দেখতে পাড়ার লোকেদের ঢল নামলো। খাওয়া শেষে সামান্য বিশ্রাম, তারপর যে যার মত বেরিয়ে পড়লাম পাড়া ও পাড়ার আশপাশ দেখতে। সন্ধ্যার পরেই খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লাম। কিসের ঘুম, একেকজনের মুখে অভিজ্ঞতার বিচিত্র সব গল্প শুনতে শুনতে রাত প্রায় দশটা বেজে গেল। এখানে বলে রাখা ভালো, পাহাড়ি এলাকা দশটা মানে কিন্তু গভীর রাত। পরের দিনের পথ একেবারে মে মং পাড়া পর্যন্ত। অসাধারণ পথ, জুম ঘর, জুম ক্ষেত আর মূহুর্তে মূহুর্তে সাদা মেঘের কোমল পরশ। এমনি করে খাল ও ঝরনা ধরে একাধিক পাহাড় চূড়া মাড়িয়ে সন্ধ্যার আগ দিয়ে কাঙ্খিত পাড়ায় উপস্থিত হতে সক্ষম হলাম।

পাড়া থেকে কংদুকত্লাং এর দূরত্ব এ্যারোপ্লেন মুডে আট কি.মি.। মাঝে রাত্রিযাপনের জন্য কোনো পাড়া নেই। সুতরাং একদিনেই ফিরে আসতে হবে। ঝিরি ধরে ট্রেকিং এর পর ওপরে বেশ কয়েকটি জুম ক্ষেত রয়েছে, সেগুলোকে কেন্দ্র করে সিঁড়ি কেটে বানানো পথ, চলতি পথে বিশ্রামের জন্য পরিত্যাক্ত জুমঘরগুলো ছিল বেশ উপযোগী। পরিত্যাক্ত হলেও চারপাশে দেখলাম রয়েছে মরিচ, বেগুনসহ নানা রকম সবজি। ইতিমধ্যেই অনেক উপরে ওঠা হয়েছে, সমস্ত পাহাড় যেন পায়ের নিচে। পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায় তাজিনডং, খানিক ফাঁকে ধনেশ পাহাড়। অনেক ধনেশ পাখির বসবাস বলে স্থানীয়রা পাহাড়টির এমন নাম দিয়েছে। দূর্গম হওয়ায় কেউ সেখানে যেতে পারে না। আরও দুই ঘণ্টা আরোহণের পর পেছনে চোখে পড়ে সবুজ পাহাড় সারির শীর্ষ ধরে লাল মাটির উজ্জল রেখা। অল্প পড়াশোনা জানা গাইড লালতন বম অনেক খবর রাখে। সে জানাল, রেখাটি আসলে নির্মানাধীন পথ, যা টেনে নিয়ে যাওয়া হবে থানচী থেকে মদক পর্যন্ত। পথটি মূলত দীর্ঘ দিন পর সংস্কার করা হচ্ছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনী তাদের রণকৌশলের অংশ হিসেবে পথটি তৈরি করেছিল।



সচেতন লালতন কেবল একটি ক্ষেত্রেই অসচেতনতার জোরালো স্বাক্ষর রেখেছে ৩১ বছর বয়সে ছয়-ছয়টি সন্তানের জনক হওয়ার গৌরব অর্জনের মধ্য দিয়ে। সে একজন দক্ষ শিকারীও। পশুপাখি সব শিকার করে খেয়ে ফেললে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকবে কী করে? এমন উদ্বেগের প্রতিক্রিয়ায় সে জানাল, শিকারের ক্ষেত্রে তারা একেবারে অবিবেচক নয়। যেমন মে-জুন মাসে তারা ধনেশ শিকার করে না, কারণ এটি বাচ্চ ফোটার মৌসুম। সে সময় প্রাকৃতিকভাবেই মা-ধনেশের শরীরের সমস্ত পালক ঝরে পড়ে। ফলে তাকে বাচ্চার সাথে গাছের ফোকড়ে আবদ্ধ থাকতে হয়। তাই খাবার জোগাড়ের দায়িত্ব পড়ে বাবা ধনেশের ওপর। স্বাভাবিকভাবেই বাবাকে তখন বাইরে থাকতে হয়। সুতরাং উল্লেখিত সময়ে বাবা ধনেশ শিকার করলে খাদ্যের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফোকড়ে আবদ্ধ মা ও বাচ্চাসহ পুরো পরিবার মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাদের এমন সচেতনতায় অভিভূত না হয়ে পারলাম না। পাশাপাশি ভাবলাম, কিসের জাটকা, কিসের ডিমওয়ালা মা-মাছ অথবা রানি মাছ, যা পাই নির্বিচারে সবই আমরা সাবাড় করে দেই। অবিবেচকের মত বনের পশুপাখি হত্যার বিষয় তো রয়েছেই, যা থেকে সুদূর সাইবেরিয়া ও অন্যান্য জায়গা থেকে উড়ে আসা অতিথি পাখিরাও রেহাই পায় না। অথচ এই পাহাড়ে এরা কত সচেতন।



বেলা ১২.৪৫ মিনিটের মধ্যে একে একে সকলেই কংদুকত্লাং-এ আরোহণ করতে সক্ষম হই। শেষের প্রায় পঁচিশ মিটার ট্রেইল ভীষণ বিপজ্জনক। টিনের চালার শীর্ষদেশ আকৃতির কোণ, তা-ও আবার হেলানো। বাম পশে হালকা গাছপালা থাকলেও ডান পাশটা হাজার ফুট খাড়া খাঁদ। হাত বাড়িয়ে ধরলেই ভিন্ন একটি দেশের পরশ- এ যেনো স্বপ্ন! কোনোমতে চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে শেষাংশে অপেক্ষাকৃত উঁচু প্রস্তর খণ্ডটিই কংদুকত্লাং। একজন দাঁড়ানোর মতো শৃঙ্গ। ছবি তোলার ইচ্ছা বাস্তবায়নে গাইডের সহায়তায় চূড়ায় একজনকে বসিয়ে সামনে ও বামে বাকি তিনজন বসতে হলো। নামবার পথে এক বন্ধুর মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। সুতরাং তার জন্য অপেক্ষা করতেই হলো। অপেক্ষার পর এবারও গাইডের সহায়তায় তাকে বিশেষ কায়দায় নিচে নামিয়ে আনলাম। এ দিন থে খাবার হিসেবে ছিল পর্যাপ্ত পানি এবং আগের দিন রাতে পাড়া থেকে ত্রিশ টাকায় কেনা আধছড়ি পাকা কলা।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ ডিসেম্বর ২০১৫/তারা
Appreciate for enjoy the Bangladesh Tourism 


শীতে অপরূপা বান্দরবানে পর্যটকের ভিড়
বিডি ইউএসএ নিউজ :
 
অপরূপা বাংলাদেশ। আর তেমনই অপরূপ আমাদের প্রকৃতি। ছয়টি ঋতুর মায়ায় বছরের বারো মাসই প্রকৃতি ভিন্ন রূপ মেলে ধরে এই দেশে। শীতে সারা দেশের সঙ্গে মিলিয়ে তেমনই অপরূপা বান্দরবান।

শীতে কুয়াশার চাদরে ঢাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবানে বেড়ানোর জন্য অনেকে ছুটে আসেন দূর পাহাড়ে। আর শীত মৌসুমই হলো পাহাড়ের অরণ্যের জেলা বান্দরবানের দুর্গমাঞ্চলগুলোর দর্শনীয় স্থানগুলো ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। ভ্রমণপিয়াসীদের কাছে প্রকৃতি এ সময় নিজেকে মেলে ধরে আপন সাজে।
বান্দরবানে বেড়াতে এসে কখনো মন খারাপ করে বাড়ি ফেরে না পর্যটকেরা। চিরসবুজের ছোঁয়া যাঁরা পেতে চান, তাঁদের যেতে হবে পাহাড়ি জনপদের পাহাড়ের আনাচে-কানাচে।
শীতের হিমেল পরশে সজীব হয়ে ওঠে পার্বত্য প্রকৃতিও।
বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের খ্যাতি ছড়িয়েছে এরই মধ্যে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও। আর তাই এবারের পর্যটন মৌসুম শুরু হতে না হতেই নানা হোটেল-মোটেল আর গেস্ট হাউসে শুরু হয়েছে পর্যটকদের আনাগোনা।
প্রতিবছরের মতো এবারও শীতকে সামনে রেখে বান্দরবানে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। বিদেশি পর্যটকদের ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে নীলাচল, মেঘলা, শৈলপ্রপাত ঝরনাসহ দর্শনীয় স্থানগুলোতে। শীতের শুরুতেই বান্দরবানে বিদেশি পর্যটকদের আসা আবার শুরু হওয়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন হোটেল-মোটেলের মালিকরা।
বান্দরবানের পর্যটন মোটেলের ম্যানেজার মিজানুর রহমান জানান, দেশে বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনায় বিদেশি পর্যটকদের আগমন একদম কমে গিয়েছিল। কিন্তু ইদানীং বিদেশি পর্যটকদের আগমন বেড়েছে। শীতে বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা আরো বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
বান্দরবানের মিলনছড়ি হিলসাইড রিসোর্টের ম্যানেজার রয়েল বম বলেন, ‘চলতি সপ্তাহে আমাদের রিসোর্টে ১২ জন বিদেশি পর্যটক পেয়েছি। আজকে সুইডেনের একজন পর্যটক রয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা আগের চেয়ে চলতি মাসে কিছুটা বেড়েছে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আশা করা যাচ্ছে আগামীতে আরো বাড়বে।’

শীতের সময়টা বেড়ানোর উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেয় ভ্রমণপিপাসুরা। প্রতিবছর শীতকে সামনে রেখে বান্দরবানে পর্যটকদের বাড়তি চাপ দেখা যায়। শীতের পরশে পর্যটকদের সরব উপস্থিতিতে চাঙ্গা হয়ে উঠছে বান্দরবানের আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউস, রেস্টুরেন্ট এবং পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো।

নীলাচল পাহাড়ের চূড়া থেকে সূর্যাস্ত দেখা, নীলগিরি থেকে পাহাড়ের সমুদ্র, পাহাড়ের চূড়ায় প্রাকৃতিক বগা লেক, পাহাড়ের চূড়া থেকে ঝরে পড়া রিজুক, জাদিপাই, চিংড়ি আর শৈলপ্রপাত ঝরনার হাতছানি। আছে গা ছমছমে বাদুড়গুহা, আলীর সুরঙ্গপথ। মেঘলায় লেকের ওপরে আকর্ষণীয় দুটি ঝুলন্ত সেতু, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান নামে পরিচিত স্বর্ণমন্দির, রামজাদী মন্দির, রেমাক্রি বড় পাথর, দেবতা পাহাড়, নাফাকুম জলপ্রপাত। পর্যটকরা দেখতে যান ছোট্ট পরিসরে গড়ে তোল চা বাগান, দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ সাকাহাফং, তাজিংডং বিজয়, কেওক্রাডং চূড়াও। পাহাড়ি সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ এই জেলায় আছে ভিন্ন ভাষার এগারোটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিও। জাতি আর ধর্ম নির্বিশেষে সবার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বান্দরবানের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহুগুণে।

প্রকৃতির নির্মল ছোঁয়া পেতে বান্দরবানে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভ্রমণপিপাসু মানুষরা। দেশীয় পর্যটকদের সঙ্গে বাড়ছে বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যাও। 
বিডি ইউএসএ নিউজ২৪.কম/সো/১ ডিসেম্বর ২০১৫ 

No comments:

Post a Comment