Thursday, 10 December 2015

China Tourism

 Tourism in China

ওয়াং ফু চিং-এ স্মরণীয় সন্ধ্যায়

শান্তা মারিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
Published:21 Nov 2015   05:51:24 PM   Saturday   ||   Updated:30 Nov 2015   12:03:58 PM   Monday
বিক্রি হচ্ছে জীবন্ত পোকামাকড়

বিক্রি হচ্ছে জীবন্ত পোকামাকড়

শান্তা মারিয়া

(চকবাজার টু চায়না- ষষ্ঠ কিস্তি) : রাজপথে আনমনে হেঁটে যেতে যেতে কখনও যদি দেখেন শিক কাবাব কিংবা শাসলির মতো কাঠিতে গেঁথে বিক্রি হচ্ছে পোকামাকড় তাহলে চমকে যাবার কিছু নেই। বুঝতে হবে আপনি আছেন চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে। পথ চলতি কিছু খেয়ে নেওয়ার স্বভাব পৃথিবীর সব বড় শহরের বাসিন্দাদের মতো বেইজিংগারদেরও রয়েছে পুরো মাত্রায়। বেইজিংয়ের স্ট্রিট ফুড চীনা-বিদেশী সবার কাছেই জনপ্রিয়। বেইজিং-এ প্রায় প্রতিটি ব্যস্ত সড়কেই রয়েছে স্ট্রিট ফুডের স্টল। এসব স্টলে কাবাব, বার্গার, চিকেন ফ্রাই, সুপ, রুটি, সেদ্ধ ভুট্টা, মিষ্টি, নুডুলস, পোড়া আলু আর আইসক্রিম চোখে পড়বে। কিন্তু বিশেষ ধরনের স্ট্রিট ফুডের জন্য রয়েছে কয়েকটি বিখ্যাত এলাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ওয়াং ফু চিং। চীনা ঐতিহ্যবাহী খাবারের জন্য ওয়াং ফু চিং আর শিয়ামেন ওয়াকিং স্ট্রিট বেইজিংয়ে বিখ্যাত। শুধু খাবারের জন্য নয়, চীনের ঐতিহ্যবাহী জনজীবনের স্বাদ নিতে ওয়াং ফু চিং-এর বিকল্প নেই।

অক্টোবরের এক সন্ধ্যায় প্রথম গেলাম ওয়াং ফু চিং-এ। আমি তখন চীন আন্তর্জাতিক বেতারের বিদেশী বিশেষজ্ঞ হিসেবে মাত্র কাজ শুরু করেছি। তখন পর্যন্ত বেইজিং-এর কিছুই তেমনভাবে দেখা হয়নি। সহকর্মী শিহাবুর রহমান নিয়ে গেলেন ওয়াং ফু চিং-এ। এটি বেইজিংয়ের একটি ঐতিহ্যবাহী এলাকা। থিয়ানআনমেন স্কোয়ারের খুব কাছেই এর অবস্থান। সাবওয়ে স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি এক বিশাল এলাকা। পুরো এলাকাটির নামই ওয়াং ফু চিং । তবে এর মূল আকর্ষণ হলো একটি দীর্ঘ আঁকা বাঁকা গলি। গলিটির প্রবেশপথেই চীনা রীতির বড় একটি তোরণ। এর ভেতর দিয়ে হাঁটা পথটিতে প্রবেশ করে দেখি দু’পাশে খাবারের দোকান। দোকানের খাবারগুলো খেতে হয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে। কারণ দোকানের ভেতর বসার কোনো জায়গা নেই। অনেকটা ফেরিওয়ালাদের স্টাইল। যদিও স্টলগুলো স্থায়ী।

খাবারের জিনিসগুলো দেখার পর অবশ্য আমি দারুণ চমকে উঠেছিলাম। বিছাজাতীয় এক ধরনের পোকা শিকে গাঁথা রয়েছে। জ্যান্ত। চাইলে ঈষৎ ঝলসে নেওয়া যায় আগুনে। তাহলেও পোকাগুলো জ্যান্তই থাকবে। মাজরা পোকা ধরনের পোকাও রয়েছে। রয়েছে কোকুন বা পোকার ডিম। স্টার ফিশ, সি হর্স, জেলি ফিশ আরও নানা ধরনের সামুদ্রিক পোকামাকড়। আর রয়েছে মাকড়শা। সবই জীবন্ত!

দেখে পিলে চমকে উঠতে পারে তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বিষাক্ত নয় কোনোটিই। একশিক ১০ ইউয়ান বা ১১৩ টাকা। এগুলো মূলত টুরিস্টদের মজা দেওয়ার জন্য। ইউরোপ-আমেরিকার টুরিস্টরা দেখলাম এগুলো কিনে খাচ্ছে এবং হুড়োহুড়ি করে ছবি তুলছে। একই দামে আরও রয়েছে শিকে গাঁথা ছোট পাখির বা মুরগির বাচ্চার রোস্ট। এগুলো খুবই ছোট, যেন সদ্য ডিম ফোটা শাবক। শুধু পালক ছাড়ানো হয়েছে। দেখলে মনে হয় ডায়নোসরের বাচ্চা। গরু, ছাগল, শূকরের মাংসের শিক কাবাব বা ছুয়ান রয়েছে। আছে জিহ্বা ভাজা। ছোট ছোট বাটিতে বিক্রি হচ্ছে ভুড়ি, চামড়া ভাজার সুপ। মিস্টি খাবারের আয়োজনও রয়েছে। চেরিসহ বিভিন্ন ফল শিকে গেঁথে গরম চিনির শিরায় ঢেলে দেওয়া হয়। এটি চীনের খুব জনপ্রিয় খাবার। ঐতিহ্যবাহী তো বটেই।


ওয়াং ফু চিং-এ লেখক

চীনের আরেকটি মজার খাবার রয়েছে। গরম চিনির শিরা সরু নলের মধ্য ঢেলে ফুঁ দিয়ে চিনির পুতুল বানানো হয়। শূকর, ড্রাগন, খরগোশ ইত্যাদি বিভিন্ন আকৃতির হয় বাতাস ভরা এই পুতুলগুলো। পুতুলের মধ্যে রং দিয়ে চোখ, মুখ এঁকে দেওয়া হয়। এই চিনির পুতুল একটা কাঠিতে গেঁথে ধরিয়ে দেওয়া হয় ক্রেতার হাতে। এত দ্রুত বিক্রেতা এই পুতুল বানায় যে দেখে অবাক হতে হয়।

ওয়াং ফু চিং-এ পঁচা ডিম বেশ জনপ্রিয় একটি খাবার। পঁচা ডিম শুনে আঁতকে ওঠার কিছু নেই। এই ডিম প্রসেসড করা। আমি অবশ্য খেতে গিয়ে বিদঘুটে গন্ধ পেয়ে আর খেতে পারিনি। তবে অনেকের কাছে শুনেছি খেতে নাকি ভালোই। ওয়াং ফু চিং-এ অবশ্য খাসির কাবাব বা ইয়াংরো ছুয়ান, সেদ্ধ ভুট্টার মতো খাদ্যও পাওয়া যায়। এর মধ্যে ইয়াংরো ছুয়ান আমার প্রিয় খাদ্য। বিশেষ করে বেশি করে ঝাল মরিচের গুঁড়ো দেওয়া ইয়াংরো ছুয়ান আমার দারুণ পছন্দের।

দেখলাম ডাবের পানি বিক্রি হচ্ছে। ডাব এমনিতেই আমার খুব প্রিয়। চীনে এসে খাব না তাতো হয় না। তবে বিক্রির কায়দা আমাদের দেশের মতো নয়। ডাব বা নারিকেল পরিস্কার করে খোসা ছাড়িয়ে পাতলা সেলোফেন কাগজে মুড়ে স্ট্রসহ ধরিয়ে দেওয়া হয়। দামটিও বেশ ১৫ ইউয়ান। এটি চীনে বেশ জনপ্রিয় পানীয়।

ছোট ছোট মাটির পাত্রে মুখ বাঁধা অবস্থায়  রয়েছে পায়েস। আসলে দুধে চাল সেদ্ধ বলাই ভালো। খেতে? খারাপ নয়, তবে চিনি কম। ওয়াং ফু চিং-এ রাস্তার পাশের বিভিন্ন দোকানে শুঁটকি মাংস পাওয়া যায দেদার। রঙিন কাগজে মোড়ানো। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম লজেন্স। পরে খেতে গিয়ে দারুণ ঠকেছি। বরং সেদ্ধ ভুট্টা বিক্রি হচ্ছে দেখলে স্বস্তি লাগে। বেশ ভালো স্বাদ। চীনারা এমন পদ্ধতিতে ভুট্টা সেদ্ধ করে যে দানাগুলো নরম হয়ে যায়। আমাদের দেশে তো ভুট্টাপোড়া খেতে গিযে দাঁতের উপর রীতিমতো অত্যাচার চালানো হয়।


ওয়াং ফু চিং-এ শিল্প সামগ্রী

অন্যান্য পানীয়ের মধ্যে কোক, স্প্রাইট এবং বিভিন্ন ফলের জুস পাওয়া যায় প্রচুর। আর বিয়ার ও অন্যান্য হার্ড ড্রিংকসের কথা না হয় নাই বললাম। ওয়াং ফু চিং-এ বড় সড়কে গাড়ি চলার অনুমতি নেই। এখানে সবাই হেঁটে বেড়ান। এটা করা হয়েছে পর্যটকদের জন্য। অক্টোবরের সেই সন্ধ্যাটি ছিল দারুণ সুন্দর! ওয়াং ফু চিং-এর বড় প্রশস্ত সড়কে একটি মেলা বসেছিল। চারিদিকে নানা রকম সুভ্যেনির বিক্রি হচ্ছে। হালকা শীত। মনে হচ্ছিল আমি যেন একটি বিদেশি চলচ্চিত্রের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। সেই সন্ধ্যার পর আরও অনেকবার ওয়াংফুচিংয়ে গিয়েছি। বেইজিংযে এটি ছিল আমার অন্যতম প্রিয় জায়গা। ওয়াং ফু চিং-এ গেছি ক্রিসমাসের সময়। সড়কের ওপর বড় বড় ক্রিসমাস ট্রি সাজানো দেখেছি। এখানকার ম্যাকডোনাল্ডসও কেএফসিতে খেয়েছি অনেকবার।

ওয়াং ফু চিং-এ এই দুটি চেইন শপেরই বিশাল বিশাল আউটলেট রয়েছে। আর এই ফাঁকে বলে রাখা ভালো ওয়াং ফু চিং শপিংয়েরও স্বর্গ। এখানে রয়েছে আন্তর্জাতিক সব ব্র্যান্ড শপ। ঘড়ি, গয়না, কাপড়চোপড়, প্রসাধনী সব পাওয়া যায়। সেখানে রয়েছে চীনের বিখ্যাত চায়ের দোকান। এই দোকানটি প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো। এতে জেসমিন টিসহ বিভিন্ন ধরনের চায়ের প্যাকেট পাওয়া যায়। খোলা অবস্থাতেও রয়েছে চা। চীন দেশে গোলাপ থেকে শুরু করে চন্দ্র মল্লিকাসহ বিভিন্ন ফুলের চা তৈরি হয়।

ওয়াং ফু চিং-এ একটি বিখ্যাত টুপির দোকান আছে। এই দোকানটিও অনেক প্রাচীন। রয়েছে বিখ্যাত চীনা রেশম বা চায়না সিল্কের দোকান। আর রয়েছে চীনের ঐতিহ্যবাহী ছোট বড় শোপিস বা স্যুভেনির। রাস্তার দু’পাশেই মিলবে এসব। বুদ্ধ মূর্তি থেকে শুরু করে নানা রকম পুতুল, ঢোল, চীনের বাঁশি, গয়নার বাক্স, ব্যাগ কী নেই। আধুনিক খেলনাও প্রচুর। খেলনার জন্য অবশ্য আলাদা কয়েকটি বিশাল দোকানও রয়েছে। খেলনার দোকানগুলোতে গেলে মনে হয় শিশুদের স্বর্গরাজ্যে এসে পড়েছি। কত যে খেলনা তার আর ইয়ত্তা নেই!

চীন আন্তর্জাতিক বেতারের বাংলা বিভাগ থেকে ওয়াং ফু চিং-এর ওপর একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করা হয়। সেটি আমি এবং  সহকর্মী জিনিয়া ওয়াং উপস্থাপনা করি। ওয়াং ফু চিং-এ পরে বহুবার গিয়েছি তবে প্রথম সেই সন্ধ্যাটি ছিল অসাধারণ সুন্দর। আমার জীবনের এক স্মরণীয় সন্ধ্যা হিসেবে সেটি চিরদিন মনের গভীরে রয়ে যাবে।

ছবি : শিহাবুর রহমান

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ নভেম্বর ২০১৫/তারা

 

পান্ডার রাজ্যে || শান্তা মারিয়া

শান্তা মারিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
Published:24 Nov 2015   06:57:54 PM   Tuesday   
আদুরে পান্ডা

আদুরে পান্ডা

(চকবাজার টু চায়না- সপ্তম কিস্তি) : ‘গুন্ডাপান্ডা’ শব্দটি প্রচলিত থাকলেও চীনের পান্ডারা মোটেই গুন্ডা নয়। বরং উল্টো। পান্ডা অত্যন্ত নিরীহ গোছের প্রাণী। অবশ্য তেমন কোণঠাসা হলে পান্ডাও আক্রমণ করে বসতে পারে, তবে তেমনটি সচরাচর ঘটে না। যাই হোক চীনে এসে পান্ডা দেখাটা রীতিমতো ফরজ। তাই ডিসেম্বরের এক ভোরবেলায় শিহাব আর আমি রওনা হলাম বেইজিং জুর উদ্দেশে। পৃথিবীর বিখ্যাত ও সুন্দর চিড়িয়াখানার মধ্যে বেইজিং জু অন্যতম। শহরের মধ্যেই বেইজিং জু মূলত মিং সম্রাটদের আমলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বিশাল এলাকা নিয়ে এই চিড়িয়াখানা। এর ল্যান্ডস্কেপ অপূর্ব সুন্দর। চীনের যে কোনো পার্ক যেমন জলাশয়, পাহাড়, বাগান, ভাস্কর্য নিয়ে গড়ে ওঠে, এই চিড়িয়াখানাও তার ব্যাতিক্রম নয়। বিশেষ করে বাঘের একটি বিশাল ভাস্কর্য রয়েছে যা শিল্প হিসেবে অনবদ্য। চিড়িয়াখানায় ঢুকে চোখ জুড়িয়ে গেল ভিতরের ল্যান্ডস্কেপে। যদিও তখন ডিসেম্বর মাস। বেশ শীত। হাত-পা জমে যাওয়ার অবস্থা। দিনটা রোদেলা। বেইজিংয়ের উত্তাপহীন বিশেষ রোদ মন ভালো করে দিলেও শীতের হাত থেকে একটুও বাঁচাতে পারে না।

চিড়িয়াখানায় প্রথম গেলাম পান্ডার আস্তানায়। পান্ডার জন্য বরাদ্দ বিশাল একটি এলাকা। চীনের জাতীয় পশু। একে নিয়ে চীনাদের আহ্লাদের সীমা নেই। বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী বলে অবশ্য সারা পৃথিবীতেই এদের কদর। চীন সরকার এদের সংরক্ষণে খুব উদ্যোগী। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এদের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে জোরে শোরে। পৃথিবীর খুব বেশি চিড়িয়াখানায় পান্ডা নেই। চীন সরকার পান্ডা বিক্রি করে না। অন্য চিড়িয়াখানায় ভাড়া দিতে পারে। যেসব চিড়িয়াখানা চীন সরকারের কাছ থেকে পান্ডা ভাড়া নেয় তাদের প্রতিবছর এ জন্য বেশ মোটা টাকা দিতে হয়। ফলে পান্ডাকে রোজগারী প্রাণীও বলা যায়।

কাচে ঘেরা বিশাল এক এলাকায় তাদের থাকার ব্যবস্থা। এই কাচের প্যাভিলিয়নের ভিতরে পান্ডার জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক আবহাওয়া বিরাজ করছে। পান্ডারা বাঁশের কচি ডগা খেতে পছন্দ করে। তাদের জন্য বাঁশ ঝাড় রয়েছে সেখানে। আরও রয়েছে তাদের বিভিন্ন পছন্দের খাবার। পান্ডা ভীষণ অলস প্রাণী। অমিশুকও। এরা একা থাকতেই ভালোবাসে। ভিতরে দেখলাম কয়েকটি পান্ডা গাছের ডালে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। দুয়েকটি বাচ্চা পান্ডা খেলা করছে। শিহাবুর রহমান ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন পান্ডার ভিডিও করার জন্য। আমারও খুব মজা লাগছিল পান্ডা ছানাদের দেখতে। দেখলেই সফট টয়েজ বলে মনে হয়। চীনে আদুরে পান্ডা বলে একটা কথা খুব প্রচলিত। বাচ্চাদের আদুরে পান্ডা বলে ডাকে বাবা-মায়েরা। চীনা ভাষায় পান্ডাকে বলে শিয়ান মাও। আমার এক সহকর্মী লিলিকে শিয়ান মাও বলে ডাকে তার বন্ধুরা।

বেইজিং অলিম্পিকের মাসকটও ছিল পান্ডা। চীনারা ব্যবসায় দারুণ পাকা। পান্ডার প্যাভিলিয়নের ভিতর বিক্রি হচ্ছে বেইজিং অলিম্পিকের ছবিওয়ালা পান্ডার নানা রকম স্যুভেনির। চাবির রিং, কলম, কলমদানি, ফুলদানি থেকে শুরু করে হরেক রকম জিনিস। পান্ডার সফট টয়েজও প্রচুর। কম দাম থেকে শুরু করে বেশি দামের জিনিস রয়েছে। পকেট বুঝে যার যা পছন্দের জিনিস কিনছে। আমিও ৩০ ইউয়ান দিয়ে একটা পান্ডা পুতুল কিনলাম।


কাচের মতো লেক

বেইজিং চিড়িয়াখানা বিশ্বে বিখ্যাত। ২২০ একর এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা এই চিড়িয়াখানায় ৯৫০ প্রজাতির ১৪ হাজার ৫০০ জীবজন্তু রয়েছে। বিরল প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যে এখানে রয়েছে সোনালি নাক বানর, দক্ষিণ চীনাবাঘ, সাদাঠোঁট হরিণ, ক্রেস্টেড ইবিস, চীনা কুমির, চাইনিজ জায়ান্ট স্যালামান্ডার, সাইবেরিয়ান টাইগার, ইয়াক, স্নো লেপার্ড, তিব্বতী হরিণ, চমরী গাই এবং কিয়াং।

বিশ্বের খুব কম চিড়িয়াখানাতেই গোরিলা রয়েছে। বেইজিং জু তাদের অন্যতম। এখানে বেশ কয়েকটি গোরিলা আছে। আরও আছে সিংহ, জাগুয়ার, ক্লাউডেড লেপার্ড, এশীয় ও আফ্রিকান হাতি, গন্ডার, হিপোপোটোমাস, কালো ভালুক, মেরুভালুক, টাপির, সামুদ্রিক কচ্ছপ, পেঙ্গুইন, ক্যাংগারু, শিম্পানজি, মুন্টজাক,অ্যাডাক্স, জেবরা, ভোঁদর, লেমুর, ফ্লেমিংগো ইত্যাদি। পৃথিবীর পনেরো প্রজাতির সারসের মধ্যে তেরটি রয়েছে বেইজিং চিড়িয়াখানায়। আরও রয়েছে অসংখ্য জাতের পাখি, সাপ, ইত্যাদি। বেইজিং চিড়িয়াখানায় একটা বিশালাকার অ্যাকুরিয়াম রয়েছে। যেটি বিরাট এলাকা নিয়ে অবস্থিত। সেখানে রয়েছে ডলফিন থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণী।

আমরা বাঘের দেশের মানুষ। তাই খুঁজে খুঁজে বাঘের এলাকায় গিয়ে হাজির হলাম। মুনজালা হু বা রয়েল বেঙ্গল টাইগারও রয়েছে এখানে। রয়েছে সাদা বাঘ, সিংহ, বিশালাকার সাইবেরিয়ান টাইগার। এতসব জীবজন্তুর ভিড়ে আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে বড় আপন মনে হল। বললাম, মামা, বিদেশে আছ, দেশের জন্য মন কাঁদে না?

বাঘমামা উত্তর দিলেন, হালুম, কাঁদে ভাগ্নি, কিন্তু তোমাদের মতোই পেটের দায়ে বিদেশে চাকরি করছি। তোমরা হয়তো দেশে ফিরতে পারবে। কিন্তু আমার তো আর জীবনেও সুন্দরবনে ফেরা হবে না।

বাঘমামার জন্য মনের কোণে ব্যথা নিয়ে অন্য এলাকার দিকে চললাম। লেকের পানি জমে কাচের মতো হয়ে আছে। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম সেই বরফ জমা লেকের ভিতরে লালনীল মাছ দেখা যায়। তার মানে নিচের পানি এখনও জমেনি। বড় সুন্দর সেই দৃশ্য।

চীনে বিভিন্নস্থানে বেড়াতে গিয়ে আমাদের মতো বিদেশীদের প্রতি স্থানীয় জনগণের ব্যাপক কৌতুহল দেখেছি। কোথাও গেলেই চীনারা এসে আলাপ করতে চায়। পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে। বিশেষ করে আমার কপালের টিপের প্রতি তাদের বিপুল আগ্রহ। এবারেও তার ব্যাতিক্রম হলো না। অন্য সময়ে বিষয়টা উপভোগ করলেও এবার একটু অস্বস্তি বোধ করলাম। কারণ চিড়িয়াখানায় এসে মানুষ জীবজন্তুর খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে। আমার সঙ্গে চীনাদের ছবি তুলতে চাওয়ার ব্যাপক আগ্রহের ফলে নিজেকে কিছুটা ‘এক্সিবিট’ বলে মনে হচ্ছিল।

চিড়িয়াখানাটায় বেজায় বড়। জীবজন্তু খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। তবে স্থির করেছি গোরিলা দেখতেই হবে। তাই খুঁজে খুঁজে গোরিলার বাড়ির সামনে এসে পড়লাম। গোরিলার বাড়ির সামনের চত্বরে অনেকগুলো প্রমাণসাইজ গোরিলার মূর্তি। নানা ভঙ্গিমায় গোরিলা রয়েছে এখানে। কোনো কোনোটার পিঠে চড়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। শিশুরা চড়ছে সেইসব পুতুল গোরিলার কোলে পিঠে। জীবন্ত গোরিলাদের রাখা হয়েছে কাচের বিশাল ঘরের ভিতর। ভিতরে গাছ, বাড়ি সবই রয়েছে। কাচের ঘরের ভিতর তাদের উপযোগী পরিবেশ। হা করে গোরিলার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, শিহাব মনে করিয়ে দিল অন্যান্য জীবজন্তু দেখা বাকি রয়েছে, বিশেষ করে পেঙ্গুইন। পেঙ্গুইনের ঘরও বিশাল। কাচের অ্যাকুরিযামের মধ্যে রয়েছে মেরু এলাকার পরিবেশ। পানিতে ভাসছে বরফের চাঁই। তার মধ্যে সাঁতরে বেড়াচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে পেঙ্গুইন। দারুণ লাগলো।


বেইজিং জু’তে বাঘের ভাষ্কর্য

পথনির্দেশ খুঁজে খুঁজে বিভিন্ন দিকে যাচ্ছি। ঘুরতে ঘুরতে পাখির এলাকায় এসে পড়লাম। বিশাল লেক। তার মধ্যে বিকেলের আলো এসে পড়েছে। রং বেরঙের অসংখ্য পাখি সেখানে। ঝাঁক বেঁধে উড়ছে, পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। লেকের এই অংশের পানি কৃত্রিম উপায়ে জমে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে। ফলে জলজ পাখিরা স্বচ্ছন্দে ঘুরছে এখানে। সে যে কি অপূর্ব দৃশ্য। মনে হচ্ছিল স্বপ্নের জগৎ। স্বপ্ন ভাঙিয়ে শিহাবুর রহমান মনে করিয়ে দিলেন ফিরতে হবে।

চিড়িয়াখানা এত বিশাল যে একদিনে তো দূরের কথা কয়েকদিনেও পুরো এলাকা দেখে শেষ করা সম্ভব না। এদিকে শীতে আর খিদেয় জান যায়। শুধু বিস্কিট আর চিপস নিয়ে চিড়িয়াখানায় ঢুকেছিলাম। সকাল থেকে সারা দিন কেটে গেছে। বিকেল প্রায় পাঁচটা। এখন পেটের মধ্যে ছুঁচোরা হাডুডু খেলছে। শীতে হাত পা লেকের পানির মতো জমে যাওয়ার উপক্রম। তাই চিড়িয়াখানাকে বিদায় জানিয়ে পাড়ি জমালাম ম্যাকডোনালডসের দোকানের উদ্দেশে।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ নভেম্বর ২০১৫/তারা

No comments:

Post a Comment